বিচারাঙ্গনের শীর্ষ থেকে দণ্ডিত অপরাধী

সংগৃহীত ছবি

আইন-আদালত

বিচারাঙ্গনের শীর্ষ থেকে দণ্ডিত অপরাধী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১০ নভেম্বর, ২০২১

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে ২২ জন বিচারক প্রধান বিচারপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নানা কারণে বার বার আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন। তিনিই প্রথম প্রধান বিচারপতি, যার দায়িত্বের অবসান হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বরে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম সাবেক প্রধান বিচারপতি, যিনি দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হলেন।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন এস কে সিনহা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র অমুসলিম ও আদিবাসী বিচারক, যিনি বিচারাঙ্গনের শীর্ষ পদে পৌঁছেছিলেন। প্রধান বিচারপতি হওয়ার আগে থেকেই নানা কারণে আলোচিত এস কে সিনহা তার ১০৩০ দিনের দায়িত্বে বার বার সংবাদ শিরোনামে এসেছেন নানা ঘটনায়।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের তোপের মুখে ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি সেখানে থেকেই পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। তিনি ছুটি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ পাওয়ার কথা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

জানা গেছে, সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের আলীনগর ইউনিয়নের তিলকপুর গ্রামে। তার জন্ম ১৯৫১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৪ সালে সিলেট বারে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে হাইকোর্টে এবং ১৯৯০ সালে আপিল বিভাগে তালিকাভুক্ত হন। আর হাইকোর্টে তিনি বিচারক হিসাবে নিয়োগ পান ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর। আপিল বিভাগে আসেন ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আপিল বিভাগের যে বেঞ্চ বাতিল করেছিল, এস কে সিনহা ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। এ ছাড়া ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় দেওয়া বেঞ্চেও সদস্য ছিলেন তিনি।

আপিল বিভাগে আসার ছয় বছর পর ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন এস কে সিনহা। অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদ, বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ আনা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধ, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে উত্তেজনা-এরকম বহু ঘটনায় বিচারপতি সিনহা বহুবার সংবাদ শিরোনামে এসেছেন।

সিনহার শেষ বিতর্কের শুরু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে, যা প্রথমে ছুটি এবং শেষে পদত্যাগে গিয়ে শেষ হয়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ওই রায় প্রকাশের পর থেকে পাঁচ মাসেই ঘটে যায় সব ঘটনা।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল রেখে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই রায় দেয় আপিল বিভাগ। পরের মাসের প্রথম দিন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই রায়ে প্রধান বিচারপতি সিনহার ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ থাকে। সে বছরের ৯ আগস্ট এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে কঠোর সমালোচনাও করেন তিনি।

পরদিন ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে প্রধান বিচারপতির ‘অগ্রহণযোগ্য’ বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ১২ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সিনহার সঙ্গে দেখা করে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে দলীয় বক্তব্য জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরদিন  সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে রায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের আদেশের ৪৩ দিন পর ১৬ অগাস্ট বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২২ আগস্ট প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ছাড়তে বিচারপতি এস কে সিনহাকে সময় বেঁধে দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। তা না হলে তাকে অপসারণে আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শুরুর আগে ২৪ অগাস্ট শেষ অফিস করেন বিচারপতি সিনহা। এদিন আদালতের কার্যক্রম চলার সময় বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত না করতে সংবাদকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান বিচারপতি সিনহা। সুপ্রিম কোর্টে অবকাশের মধ্যে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের ১০ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত বিদেশ সফরে ছিলেন তিনি।

এরই মধ্যে ১৩ সেপ্টেম্বর ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং তার কিছু পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব গ্রহণ করে বিচারপতি সিনহার তীব্র সমালোচনা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ১৪ অক্টোবরের বিবৃতিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৩০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের ডেকে নিয়ে বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে ‘১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ তুলে ধরেন।

বঙ্গভবনের ওই বৈঠক থেকে ফিরে পরদিন ১ অক্টোবর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি-বিচারপতি ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার, বিচারপতি ইমান আলী নিজেরা বৈঠক করে বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন।

পরে তারা প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাড়িতে গিয়ে এ বিষয়ে কথা বললে বিচারপতি সিনহা ‘দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনের’ ওই অভিযোগগুলোর ‘গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা’ দিতে পারেননি বলে বিবৃতিতে জানায় সুপ্রিম কোর্ট।

নানা নাটকীয়তার পর অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে পরদিনই ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর ছুটিতে যাওয়ার আবেদন করেন বিচারপতি সিনহা। পরে আরেক আবেদনে ছুটির সময় বাড়িয়ে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। প্রধান বিচারপতির ‘খোঁজ নিতে’ ওই বছর ৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে তার বাসায় যেতে চান বিএনপি সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইনজীবী সমিতির নেতারা। তবে পুলিশ তাদের গাড়ি আটকে দেয়।

১৩ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ায় বড় মেয়ের কাছে যান ৩৯ দিনের ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সিনহা। তার আগে সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় তিনি বিব্রত, শঙ্কিত। পরদিন ১৪ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করে বিরল বিবৃতি দেয় আদালত।

সিঙ্গাপুর থেকে কানাডায় ছোট মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার আগে ১১ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পাঠানো এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে পৌঁছায়।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সে সময় বলেন, একজন বিচারপতির মাধ্যমে দেশে জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা হয়েছিল। আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, শৃঙ্খলা বিধির নামে তা কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন বিচারপতি সিনহা।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads