জাতীয়

বিনা কারণে বের হলে গ্রেপ্তার

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১ জুলাই, ২০২১

করোনা সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধসহ শুরু হলো লকডাউন। বন্ধ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি সকল অফিস, চলবে না যানবাহন। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে শিল্পকারখানা। ব্যাংক লেনদেন হবে সাড়ে তিন ঘণ্টা। যন্ত্রচালিত যান চলাচল বন্ধ থাকলেও চলবে রিকশা।

এবার কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী, বিজিব, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারণ ছাড়া বাইরে বের হলেই গ্রেপ্তার। একই সঙ্গে হতে পারে অর্থদণ্ডসহ ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড। গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে গত দুই সপ্তাহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় আগের বিধিনিষেধের সাথে নতুন কিছু শর্ত যোগ করে গত সোমবার থেকে তিন দিনের লকডাউন জারি করা হয়েছিল। পরিস্থিতি শামাল দিতে এবার শাটডাউনের আদলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর বিধিনিষেধের লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার।

এদিকে আগামী সাত দিনের ঘোষিত কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীরা এখনো অবস্থান নেয়নি। তবে আগামী ঈদুল আজহাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি নেওয়া ব্যবসায়ীরা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাই এ লকডাউন সাত দিন থেকে যেন আরো দীর্ঘ না করা হয় সে দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটি কমপক্ষে ১৪ দিনের শাটডাউনের দাবি জানিয়েছে। নইলে দেশে করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আজ সকাল ৬টা থেকে ৭ জুলাই রাত ১২টা পর্যন্ত এই লকডাউন কার্যকর থাকবে। এই লকডাউনে যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে সেগুলো হল-কাঁচা বাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে ক্রয়-বিক্রয় করতে হবে উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। তবে তারা শুধু খাবার বিক্রি করতে পারবে, দোকানের ভেতরে গ্রাহককে সেবা দেওয়া যাবে না। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় শিল্পকারখানা চালু থাকবে। শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাট বন্ধ থাকবে। পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ থাকবে। জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান, যেমন বিয়ে, জন্মদিন, পিকনিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না। সব ধরনের যন্ত্রচালিত যানবাহন বন্ধ থাকবে। পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক, লরি, কাভার্ড ভ্যান, কার্গো ভেসেল নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। বিমান, নৌ ও স্থল বন্দরের সাথে সম্পৃক্ত অফিস এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। আইনশৃঙ্খলা, জরুরি পরিষেবা, খাদ্যদ্রব্য পরিবহন ত্রাণ বিতরণ, রাজস্ব আদায়, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি ও বেসরকারি) গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মীরা ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দেখিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। টিকা কার্ড দেখিয়ে কোভিডের টিকা গ্রহণ করতে যাওয়া যাবে। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ থাকবে, তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকিট দেখিয়ে গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে নামাজের বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রত্যেক জেলার ম্যাজিস্ট্রেট নিজ জেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলের অধিক্ষেত্র, সময় ও এলাকা নির্ধারণ করবেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করতে পারবেন। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, চিকিৎসাসেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার) বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএমপির নির্দেশনা : ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেছেন, সরকার ঘোষিত কঠোর বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে রাজধানীতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে থাকবে। জরুরি পরিষেবার বাইরে কোনো পরিবহন বের হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে কেউ যদি যৌক্তিক কারণ ছাড়া বের হন তবে গ্রেপ্তার করা হবে।

লকডাউন বাস্তবায়নে ডিএমপি যেসব ব্যবস্থা নেবে তা হলো-ঢাকা মহানগরীর প্রধান সড়কসমূহ ও অলিগলিতে পুলিশি টহল বৃদ্ধি করা হবে। ঢাকা মহানগরীর প্রবেশ/বাহির পথে এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসমূহে চেকপোস্ট ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের ডিএমপি অর্ডিন্যান্স অনুসারে গ্রেপ্তার ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। ক্ষেত্রে বিশেষে ট্রাফিক আইন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ২৬৯ ধারা অনুসারে গ্রেপ্তারসহ নিয়মিত মামলা রুজু করা হবে। মহানগরী এলাকায় নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় সহায়তা করা।

মাঠে থাকছে সশস্ত্র বাহিনী : কঠোর বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে ৭ জুলাই পর্যন্ত লকডাউনে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে। লকডাউনের বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী কাজ করবে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই কথা জানানো হয়েছে।

আইএসপিআর বলেছে, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে আরোপিত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় ১-৭ জুলাই ২০২১ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন থাকবে। কঠোর লকডাউন কার্যকর করতে পুলিশ, বিজিবির পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন রাখার কথা গত শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। আইএসপিআর থেকে গতকাল বিষয়টি আবারো নিশ্চিত করা হলো।

 

ব্যাংক লেনদেন : সরকারের জারি করা বিধিনিষিধের মধ্যে সাড়ে তিন ঘণ্টা সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে ব্যাংক। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধকল্পে সরকার কর্তৃক আরোপিত বিধি-নিষেধের মধ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে’ নতুন এই নির্দেশনা জারি করেছে।

নির্দেশনায় বলা হয়, বিধি-নিষেধ চলাকালীন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে রোববারও ব্যাংক বন্ধ থাকবে। সোমবার (৫ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত ব্যাংকে লেনদেন হবে। লেনদেন-পরবর্তী আনুষঙ্গিক অফিসিয়াল কার্যক্রম শেষ করার জন্য ব্যাংক খোলা থাকবে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। এছাড়া ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অত্যাবশ্যকীয় বিভাগগুলো যথাসম্ভব সীমিত লোকবলের মাধ্যমে খোলা রাখতে হবে। এছাড়া ব্যাংকের প্রিন্সিপাল বা প্রধান শাখা এবং সব বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা (এডি শাখা) সীমিত সংখ্যক অত্যাবশ্যকীয় লোকবলের মাধ্যমে খোলা রাখতে বলা হয়েছে। রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংক তাদের ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বিবেচনায় প্রতিটি জেলা সদরে ও উপজেলায় ১টি করে শাখা খোলা রাখতে হবে। অন্যান্য সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলা সদরে ১টি শাখা খোলা রাখতে হবে এবং জেলা সদরের বাইরে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বিবেচনায় অনধিক ২টি শাখা খোলারাখা যাবে। কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা সার্বক্ষণিক চালু এবং এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নোট সরবরাহসহ সার্বক্ষণিক চালু রাখতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে সমুদ্র, স্থল ও বিমান বন্দর এলাকায় (পোর্ট ও কাস্টমস এলাকা) অবস্থিত ব্যাংকের শাখা, উপ-শাখা ও বুথ সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিধিনিষেধ চলাকালে যেসব শাখা বন্ধ থাকবে সেসব শাখার গ্রাহক সেবা কার্যক্রম খোলা রাখা শাখার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বন্ধ শাখার গ্রাহকদের গ্রাহক সেবা প্রাপ্তি বিষয়ে অবহিত করতে উক্ত শাখার দৃশ্যমান স্থানে তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। সব খোলারাখা শাখার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনপূর্বক সীমিত সংখ্যক লোকবলের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

 

বন্ধ থাকবে নিম্ন আদালত :

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন নিয়ে বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতির আদেশক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবজনিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত সকল অধস্তন আদালত ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরিচালনা না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় প্রত্যেক চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী জেলা/মহানগরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এক বা একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক শারীরিক উপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে ওই সময় সীমিত আকারে খোলা থাকবে হাইকোর্টের ৩টি বেঞ্চ। এছাড়া ভার্চুয়ালি বসবে আপিল ও চেম্বার আদালত।

গতকাল সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, লকডাউনে নিম্ন আদালত বন্ধ থাকবে। তবে ওই সময় সীমিত আকারে খোলা থাকবে হাইকোর্টের ৩টি বেঞ্চ। এছাড়া ভার্চুয়ালি বসবে আপিল ও চেম্বার আদালত।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads