ধূসর রঙের সাড়ে তিন ফুটের গাঙ্গেয় একটি ডলফিন জেলের খাড়ির মধ্যে লাফালাফি করছিল। মাঝে মধ্যেই খাড়ি থেকে মাটিতে পড়েও লাফ মারছিল ডলফিনটি। আবার প্রাণে বাঁচতে নদীতে ফিরে যেতে মরনপন চেষ্টাও বিফলে গেল নিরিহ অসহায় গাঙ্গেয় ডলফিনটির। এ সময় বেশ কিছু উৎসুক জনতা দাঁড়িয়ে ডলফিনটির ছটফটানিও দেখছিল। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন পথচারি ও কিশোর এ ডলফিনটি আবার নদীতে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু জেলে সেই গাঙ্গেয় ডলফিনটি বিক্রি করে দেন স্থানীয় এক হাতুড়ে কবিরাজের কাছে। প্রকৃতি থেকে প্রায় হারিয়ে যাওয়া বিপন্ন এ গাঙ্গেয় ডলফিন আগুনের তাপে গলিয়ে যৌন বর্ধক তেল তৈরি করবেন ওই কবিরাজ।
গতকাল বুধবার রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে সুতিয়া নদীতে এ গাঙ্গেয় ডলফিনটি জেলের জালে আটকা পড়ে। পরে স্থানীয় নিগুয়ারি বাজারে বিক্রি করা হয় ডলফিনটি।
স্থানীয়রা জানান, বিকালে সুতিয়া নদীতে জাল ফেলে মাছ শিকারি মাসুদ রানা। পরে সন্ধ্যার পরে জাল টানতে গিয়ে টের পান বড় একটি মাছ আকটা পড়েছে। এ সময় আরো কয়েকজন মিলে ত্রিমোহনী মোড়ে জাল ভিড়িয়ে দেখে একটি শুশুক (গাঙ্গেয় ডলফিনটি) ধরা পড়েছে। পরে এ শুশুক নগিুয়ারি ইউপি ভবনের মাঠে নিয়ে যায়। শুশুক ধরা পড়ার খবর পেয়ে স্থানীয়রা ভীড় করে। এ সময় মোবারক নামে এক কবিরাজ এ ডলফিনটি কিনে নিয়ে যায়। তারা আরো বলেন এ সময় বেশ কিছু মানুষ এ শুশুকটি নদীতে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে কারো অনুরোধই শোনেনি হাতুড়ে কবিরাজ মোবারক হোসেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, নিগুয়ারি গ্রামের মৃত লোকমান হোসেনের ছেলে মোবারক হোসেন প্রায় চার দশক ধরেই কবিরাজি করে আসছে। এলাকায় তিনি হাতুড়ে কবিরাজ হিসাবে পরিচিত। তিনি এর আগেও অনেক ডলফিন থেকে তেল তৈরি করেছে। ওই দিন প্রভাব খাটিয়ে জেলের কাছ থেকে ডলফিনটি নিয়ে গেছেন তিনি। অনেকে নদীতে ছেড়ে দেওয়ার আবদার করলেও তিনি কবিরাজির জন্য (তেল তৈরি) ডলফিনটি বাড়িতে নিয়ে যান।
প্রতিবাদকারী রাহাত আকন্দ জানান, তারা বন্ধুবান্ধব মিলে প্রাণীটিকে (ডলফিন) নদীতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জেলের সাথে পেরে ওঠেননি। কবিরাজও প্রভাব খাটিয়ে ডলফিনটি নিয়ে যান। তিনি বলেন, ' ডলফিন এ এলাকার নদীতে কদাচিৎ চোখে পড়ে। এ ভাবে জেলের জালে ধরা পড়ে প্রায় হারিয়ে গেছে গাঙ্গেয় ডলফিন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম জীবিত অবস্থায় নদীতে ফিরিয়ে দিতে ডলফিনটিকে।
আমির আলী (৭৫) বলেন এক সময় এ সুতিয়া নদী ও পাশের বানার নদীতে সহজেই চোখে পড়ত শুশুক। এখন আর চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে ভুলে চক্করে জালরা ধরে বিক্রি করে। তিনি বলেন, শুশুক (ডলফিন) টির দৈর্ঘ্য আনুমানিক সাড়ে তিন ফুট লম্বা হতে পাড়ে। গায়ের রঙ ধূসর ছিল। মুখের আকৃতি লম্বাটে।
ডলফিন নিয়ে গবেষণাকারী জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড.মনিরুল খান বলেন, এ গাঙ্গেয় ডলফিন বিপন্ন হওয়ার তালিকায় রয়েছে। এটা শিকার ,বিক্রি আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধের শান্তি তিন বছরের জেল ও তিন লক্ষ টাকা জরিমানা। তিনি বলেন সুন্দরবন এলাকায় কিছু দেখা যায়। বিক্ষিপ্ত ভাবে দেশের বিভিন্ন ছোট বড় নদীতে চোখে পড়ে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে কিছু সংখ্যক গাঙ্গেয় ডলফিন এখানো রয়েছে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণি অপরাধ ধমন ইউনিটের পরিদর্শক অসিম মল্লিক বলেন, খবর পেয়েছি। আমরা খুব দ্রুত বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিনটি উদ্ধারের কাজ শুরু করছি। আশা করি জীবিত ই উদ্ধার করতে সক্ষম হব।





