শিক্ষা

বিফলে যাচ্ছে প্রশিক্ষণ

  • ''
  • প্রকাশিত ২৫ মে, ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নানা জায়গায় কাজ করতে আগ্রহীও থাকেন। কিন্তু সঠিক জায়গায় পদায়ন না হওয়ায় তারা প্রশিক্ষণের জ্ঞান কাজে লাগাতে পারছেন না। এ জন্য প্রশিক্ষণের প্রকৃত ফলাফল পাচ্ছে না সরকার। ফলে বিফলে যাচ্ছে প্রশিক্ষণে ব্যয় হওয়া অর্থ।

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত ব্যক্তিকে পদায়নের মূল অন্তরায় রাজনীতিকীকরণ। এখন পদায়ন হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। দলীয় আনুগত্য না হলে যতই যোগ্য হোন ভালো পদায়ন পাওয়া যায় না। অনেকের যোগ্যতা না থাকলেও তদবিরের জোরে বাগিয়ে নিচ্ছেন ভালো পদ। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়নের বিষয়টি অস্বীকার করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী। তার দাবি, সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে পদায়নে সরকার আন্তরিক। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘রাইট পারসন রাইট প্লেস’ নিশ্চিতের বিষয়ে একটি সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে।

সাবেক আমলা-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণ দিয়ে যাদেরকে দেশে আনা হচ্ছে তাদেরকে সঠিক জায়গায় পদায়ন না করায় প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় হওয়া অর্থ বিফলে যাচ্ছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অনুযায়ী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়ন না পাওয়ার বিষয়ে সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, এর প্রধান কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন। এখন তো যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হয় না। পদায়ন হয় কে সরকারের আদর্শে বিশ্বাসী, কার তদবিরের জোর কত-তার ওপর ভিত্তি করে। এটাই হচ্ছে সমস্যা। রাজনৈতিক বিবেচনা উঠে গেলেই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদায়ন সম্ভব হবে।

সরকারের সাবেক সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছাই মূল বিষয়। সরকার যদি যোগ্য জায়গায় যোগ্য ব্যক্তিকে না দেয় তবে কী করার আছে, প্রশাসন তো সরকারের অধীন। যোগ্য জায়গায় যোগ্য ব্যক্তিকে বসানোর ক্ষেত্রে একটাই প্রতিবন্ধকতা, তা হলো সুশাসন নেই। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদের সময় পর্যন্ত কিছুটা হলেও মানা হতো, যে যোগ্য তাকে তার উপযুক্ত জায়গায় দেওয়া হতো। স্বৈরাচার বলেন আর যাই বলেন, মোটামুটি সিভিল সার্ভিসে দলীয়করণ ছিল না। কিন্তু ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর দলীয়করণ শুরু হলো, ফলে কারও জনতার মঞ্চ, কারও অনেক রাতে মুখ ঢেকে পালানোর মঞ্চ হলো। তখন থেকে আর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার প্রশ্ন নেই। ও আমার লোক, তার নামের পাশে আওয়ামী লীগ আছে, সুতরাং তাকে ভালো পোস্টিং দাও। সে পদার্থ, কী অপদার্থ সেটা ভাবার দরকার নেই। আবার বিএনপি যখন আসবে তারা বলবে, এগুলো তো আমার লোক, আওয়ামী লীগ আমলে নির্যাতিত হইছে, এখন ভালো পোস্টিং দেই। এটাই চলছে এখন পর্যন্ত। সরকার আর দল একাকার হয়ে আছে।
বদিউর রহমান আরও বলেন, প্রশাসনের মানুষগুলোও এখন বুঝে গেছে, দল করলে মজা আছে। শুধু ভালো পোস্টিং নয়, মেয়াদ শেষে ঠিকাদারি (চুক্তিভিত্তিক) নিয়োগ পাওয়া যায়। বছরের পর বছর সেই মেয়াদ বাড়ানো যায়। দলের মধ্যে গিয়ে একটু ঢোকা যায়। রাজনীতিকীকরণ করতে পারেন। যে দলীয় আদর্শ লালন করে তাকে তো আপনি একটু ফেভার করবেনই। দলীয় লোক যোগ্য হলে তাকে যোগ্য জায়গা দেবেন, দোষের কিছু নয়। কিন্তু ক-বোঝে না, খ-বোঝে না, খালি দল বোঝে। তাহলে তাকে উঠিয়ে দেওয়া হলে সমস্যা। আবার শুনলেন কেউ বিরোধী দলের, তাকে দিলেন ফাঁসিয়ে, বঞ্চিত করলেনÑ এটা হলো অপরাজনীতি। মূল সমস্যা হলো এটি।

তবে পদায়ন নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকলেও তা মানতে নারাজ বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে পদায়নের প্রাকটিসটা আমরা করে যাচ্ছি। এ বিষয়ে যাতে আরও গুরুত্ব দিতে পারি, সে জন্য একটি সফটওয়্যার ডেভেলপ করেছি। এটার (সরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি) তিনটি কম্পোনেন্ট রয়েছে। একটি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, আরেকটি অর্গানাইজেশন ম্যানেজমেন্ট। এছাড়া আরেকটি বিষয় থাকবে তা হলো পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট। অর্গানাইজেশন ম্যানেজমেন্টের মধ্যে থাকবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। অধীন দপ্তর-সংস্থার আকার কেমন হবে, কী ধরনের কাজ হবে, কোন ধরনের যোগ্যতার লোক লাগবেÑ এসব বিষয় আমরা অটোমেশনের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করবো, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, বিভাগগুলো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। সময় বাঁচবে, দক্ষতা বাড়বে। সফটওয়্যারটি পরীক্ষামূলক চলছে।

এ সিনিয়র সচিব বলেন, আমরা কর্মকর্তাদের যেসব তথ্য সংরক্ষণ করি, সেখানে আগে ৫৮টি ক্ষেত্রে তথ্য রাখা হতো। এখন প্রায় সাড়ে চারশ ক্ষেত্রে তাদের তথ্য সংরক্ষণ করব। এত তথ্য থাকায় সঠিক স্থানে সঠিক ব্যক্তিকে পদায়ন করা সম্ভব হবে। এতে কর্মদক্ষতা বাড়বে।
জানা গেছে কয়েক মাস আগে ১২ কর্মকর্তাকে অর্থ বিভাগে পদায়নের অনুরোধ জানিয়ে অর্থ-সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে দুটি চিঠি পাঠান। এরমধ্যে মাত্র তিনজন কর্মকর্তাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। বাকিদের দেওয়া হয়নি। যদিও তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ আছে। প্রত্যাশিত জনবল না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সিনিয়র সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত পোষণ করি, আবার পাশাপাশি দ্বিমতও পোষণ করি। যারা অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে বাইরে পড়াশোনা করে এসেছেন, সে ধরনের ডিগ্রিগুলো রয়েছে, এর মানে এই নয় যে, তাদের সবাইকে অর্থ বিভাগে কাজ করতে হবে। যারা দক্ষ কর্মকর্তা তাদের একটি-দুটি মন্ত্রণালয় নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে রাখতে চাচ্ছি। এতে সব জায়গায় তারা পারফর্ম করতে পারবে। যে যে বিষয়ে লেখাপড়া বা প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাকে সেই সংশ্লিষ্ট দু-একটি মন্ত্রণালয়ে সবসময় দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ, আমরা সব মন্ত্রণালয়কে সমভাবে সেবা দিতে চাই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads