আশরাফুল ইসলাম
রাজউক সম্প্রতি তিনটি জেলা (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর), চারটি সিটি করপোরেশন (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ), পাঁচটি পৌরসভা (সাভার, তারাবো, কালীগঞ্জ, সোনারগাঁ ও কাঞ্চন) এবং ৬৯টি ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। পরিকল্পনাটির অন্তর্নিহিত দর্শন হচ্ছে ঢাকাকে একটি মানবিক শহর হিসেবে গড়ে তোলা। পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হচ্ছে ন্যায়সঙ্গত বা অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা অর্থাৎ সব আর্থসামাজিক শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রয়োজন আর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
পরিকল্পনা প্রণয়ন পদ্ধতি : পরিকল্পনা প্রণয়নে মোট পাঁচটি ধাপ অনুসরণ করা হয়েছে। প্রারম্ভিক ধাপ, জরিপ কার্য, অন্তর্বর্তীকালীন ধাপ, খসড়া পরিকল্পনা ধাপ, চূড়ান্ত পরিকল্পনা ধাপ। প্রতিটি ধাপে খসড়া প্রতিবেদন তৈরির পর তা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত ৩৯ সদস্যবিশিষ্ট কারিগরি ব্যবস্থাপনা কমিটির সামনে উপস্থাপন ও তাদের মতামতের ভিত্তিতে সংযোজন/বিয়োজনের পরে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জনগণের অংশগ্রহণ : বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় রাজউক আওতাধীন এলাকার সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠন, সাংবাদিক ফোরাম, ব্যবসায়ী সমিতি, গার্মেন্ট কর্মী, হকার, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং রিকশাচালক, স্কুলভিত্তিক কর্মশালা বা দ্রুত মূল্যায়ন কর্মশালা, সেভ দ্যা চিলড্রেনের সঙ্গে শিশুবান্ধব নগর পরিকল্পনাবিষয়ক কর্মশালা, সমগ্র রাজউক এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন পরিষদে ভিন্ন ভিন্ন পেশাজীবীকে টার্গেট করে প্রশ্নপত্রভিত্তিক জরিপ কাজ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের মতবিনিময় প্রক্রিয়া অবলম্বনে সবার অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রস্তাবনাসমূহ
নিয়ন্ত্রিত মিশ্র ভূমি ব্যবহার উৎসাহকরণ : মিশ্র ব্যবহার এলাকায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার যেমন পরিবেশ দূষণকারী এবং ভারী শিল্পসমূহ পরিহার করা হয়েছে। এলাকার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং জনমানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নকারী সব কর্মকাণ্ড মিশ্র ব্যবহার এলাকায় নিষিদ্ধ করে তা সম্পূর্ণ আলাদা জোনের প্রস্তাব করে একটি বাসযোগ্য এবং কার্যকর এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা নিয়ন্ত্রিত মিশ্র ব্যবহারের প্রস্তাবনার অন্যতম উদ্দেশ্য।
জনঘনত্ব বিন্যাস পরিকল্পনা : ঢাকা কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ কমাতে, বিভিন্ন এলাকায় সুষম উন্নয়ন এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র মেট্রোপলিটন এলাকাকে একটি বাসযোগ্য ও কার্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে এলাকার বিদ্যমান ধারণক্ষমতা, সড়ক অবকাঠামোর ধারণক্ষমতা, বিদ্যমান নাগরিক সুবিধাদি, বিদ্যমান উন্নয়নের মাত্রা বা ধরনসহ অন্যান্য নিয়ামকের ওপর ভিত্তি করে এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব/উচ্চতা জোনিং প্রণয়ন করা হয়েছে।
নৌপথের সমন্বয়ে ব্লু নেটওয়ার্ক : নদী, খাল এবং লেক সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত বিভিন্ন ধরনের জলাশয় যেমন নদী, খাল এবং লেক ইত্যাদিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সড়কপথের পাশাপাশি উপেক্ষিত জলপথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫৬৬ কিমি নৌ-চলাচলের উপযোগী নৌপথ উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে।
অবকাঠামোর সার্বিক রূপান্তরে ‘নগরজীবন রেখা’ : ‘নগরজীবন রেখা’ বলতে মূলত সড়কপথ, রেলপথ ও জলপথের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বোঝানো হচ্ছে; যেখানে সব মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করবে, যা উল্লেখিত যোগাযোগ অবকাঠামোর বর্তমান ধারণাকে প্রতিস্থাপন করে।
নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আবাসনের বিধান পুনর্নির্ধারণ : নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য সুলভ আবাসনের বিধান পরিমার্জনের মাধ্যমে সাধারণভাবে প্রযোজ্য বিধানের তুলনায় এর শিথিলকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে নিম্নআয়ের মানুষের আবাসনের জন্য রেন্টাল হাউজিংসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই প্রেক্ষিতে এবারের পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সুলভ আবাসনের সংস্থান রাখার বিনিময়ে উন্নয়ন প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে করে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমেও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আবাসন জোগানের পথ প্রশস্ত হবে এবং তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
ব্লকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতি : ব্লকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উল্লম্ব অর্থাৎ উচ্চতা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা, যাতে যত্রতত্র নগরাঞ্চল সম্প্রসারণ কমিয়ে আনা এবং শহরের নিচু জমি ও কৃষি জমির সুরক্ষা হয়। প্লটভিত্তিক আবাসন প্রকল্প পদ্ধতিতে অবকাঠামোগত খরচ অনেক বেশি, বৈচিত্র্য অনেক কম এবং অকার্যকর। অন্যদিকে ব্লকভিত্তিক আবাসন পদ্ধতিতে অবকাঠামোগত খরচ অনেকটা কম, কার্যকর ও বৈচিত্র্যময় এবং অধিদপ্তর নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করা যায়।
সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা : ঢাকার সঙ্গে আশপাশের শহরকে যুক্ত করতে ৫টি মেট্রো, ২টি বিআরটি, ৬টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের সমান্তরালে ২টি প্রধান সড়ক, ২টি রিংরোড, রিংরোডের সাথে সংযুক্ত রেডিয়াল রোড এবং বৃত্তাকার নৌপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। মহানগরীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনয়ন এবং যানজট নিরসনে বাস রুট ফ্রানচাইসের মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন : মেট্রো স্টেশন, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল বা নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে এর সংলগ্ন এলাকা মূলত ট্রানজিটভিত্তিক ডেভেলপমেন্ট হিসেবে উন্নয়ন লাভ করে। ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন এক ধরনের নগর উন্নয়ন, যেখানে গণপরিবহন কিংবা ট্রানজিট স্টেশনকে কেন্দ্র করে মিশ্র উন্নয়ন অর্থাৎ আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা গণপরিসর তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে গণপরিবহনের মাধ্যমে জনসাধারণ কর্তৃক রাইডার শিপ বৃদ্ধি করে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হয়। প্রস্তাবিত এমআরটি, বিআরটি লাইনের সাথে সমন্বয় করে স্টেশনকে কেন্দ্র করে টোকিও, সিউল ইত্যাদি শহরের আলোকে টিওডি জোনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলে অগ্রাধিকারমূলক নির্দেশনা : অযান্ত্রিক যানবাহন ও পথচারীদের হাঁটার অনুকূল পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট যাত্রার প্রায় ৩৫% অযান্ত্রিক যানবাহন দ্বারা এবং ৪০% হাঁটার মাধ্যমে হয়ে থাকে। সাইকেলের জন্যে আলাদা লেন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ভিত্তিক অঞ্চলের ধারণা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাবনা : যারা যে এলাকায় বসবাস করবে, তাদের ছেলেমেয়েরা সেই এলাকায় অবস্থিত স্কুলে ভর্তি হবে। ঢাকা শহরের দুর্বিষহ যানজটের অন্যতম কারণ একমুখী স্কুল/কলেজের অবস্থান। ঢাকা শহর অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে প্রবৃদ্ধির দিকে গেলেও শুধু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী এই সুবিধা ভোগ করছে। পরিকল্পনায় অঞ্চলভিত্তিক ৬২৭টি বিদ্যালয় এবং ১২৩টি হাসপাতালের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণ : মহানগরের পাঁচটি বৃহৎ আঞ্চলিক পার্ক, ৪৯টি জলকেন্দ্রিক পার্ক, ৫টি বৃহৎ ইকোপার্ক (ভাওয়াল বনসহ) এবং ৮টি অন্যান্য পার্ক এবং খেলার মাঠের প্রস্তাবনা করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান পার্কগুলোকে দখলমুক্ত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
উন্নয়ন স্বত্ব-বিনিময় পদ্ধতি : ঐতিহাসিক স্থাপনা, কৃষিজমি, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল বা সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষণে, উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময় পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
মানুষের সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের নিমিত্তে এর রাজধানী শহরের জন্য সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও কৌশলের সমন্বয়েই এবারের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
লেখক : প্রকল্প পরিচালক, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা





