আমাজনের পর পদ্মাকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বের দ্বিতীয় খরস্রোতা নদী হিসেবে। প্রবল-প্রমত্তা পদ্মায় তাই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। সেতুর প্রধান প্রকৌশলী প্রয়াত ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী জানিয়েছিলেন, সেকেন্ডে ১৪০ হাজার ঘন মিটার পানি প্রবাহিত হয় পদ্মায়। একারণে তিনি সেতুর নকশা প্রণয়নের সময় এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। নদীর গতিপথ ঠিক রেখে দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ ভাবিয়ে তোলে প্রকৌশলীদেরও। আর তাই সেতুর প্রকৌশলগত জটিলতা নিরসনে তৈরি করা হয়েছিল বিশেষজ্ঞ প্যানেল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন আমৃত্যু সেই প্যানেলের প্রধান। কেবল সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়েই লেগে যায় কয়েক বছর। একইসঙ্গে, সড়ক ও রেল চলাচলের জন্য দ্বিতল এই সেতুর ভূমিকম্প, মাটির ক্ষয়সহ যে কোনো আঘাত প্রতিরোধ করে দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার মতো মহাকর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন ছিল রীতিমতো স্বপ্ন। কিন্তু সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে প্রবল-প্রমত্তা পদ্মাকে বশে এনে স্বপ্ন আজ বাস্তবে ধরা দিয়েছে। এরইসাথে রেকর্ড বইয়েও ঢুকে পড়েছে পদ্মা সেতু। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সূত্রমতে, পদ্মা বহুমুখী সেতু এখন তিনটি বিশ্বরেকর্ডের মালিক। প্রথমটি হলো-সেতুর পাইলিং সংক্রান্ত। ১২২ মিটার গভীরে তিন মিটার ব্যাসার্ধের স্টিলের যে পাইল বসানো হয়েছে তা এখনো পর্যন্ত বিশ্বের যে কোনো সেতুর তুলনায় সর্বোচ্চ। বিশ্বের আর কোনো সেতু নির্মাণে এত মোটা ও এত গভীরে পাইলিং করার প্রয়োজন হয়নি। দ্বিতীয় রেকর্ডটি হলো, ভূমিকম্প সহনীয়তা সম্পর্কিত। প্রকল্প সূত্র বলছে, ১০ হাজার টন সক্ষমতার ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিং’ বিশ্বে আর কোনো সেতুতে এর আগে ব্যবহার করা হয়নি। এর ফলে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে পদ্মা সেতু। আর তৃতীয় রেকর্ডটি হলো নদীশাসন-সংক্রান্ত। চীনের ঠিকাদার সিনোহাইড্রো করপোরেশনের সঙ্গে নদীশাসনে ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের যে চুক্তি হয়েছে এককভাবে এত বড় দরপত্র আর কোনো সেতুর বেলায় ঘটেনি। এছাড়া, পদ্মা সেতুতে পাইলিং ও খুঁটির কিছু অংশে অস্ট্রেলিয়া থেকে অতি মিহি (মাইক্রোফাইন) সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে যা সাধারণত ব্যবহার করা হয় না বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ সব ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে ১০০ বছর ঠিকে থাকার শক্তি রয়েছে এই সেতুর। ভূমিকম্প ও মাটির ক্ষয়সহ যে কোনো ধরনের ঘাত-প্রতিরোধী যেন হয়, সেজন্য বাঁকা করে নদীর তলদেশে নিয়ে গাঁথা হয়েছে খুঁটি। সড়ক ও রেল দুই ধরনের যানবাহনের ভার বহনে সক্ষম করে তুলতে খুঁটিগুলোকে ৪২ তলা ভবনের সমান ৪২০ ফুট গভীরে পুঁতে দেওয়া হয়েছে!
তবে এত গভীরতায় খুঁটি স্থাপন করতে গিয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল হ্যামার। কারণ এরকম গভীর ও খরস্রোতা নদীতে পাইলিংয়ের জন্য যে বিশালাকৃতির হ্যামার প্রয়োজন তা পৃথিবীর কোথাও ছিল না। শেষ পর্যন্ত জার্মানপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি থেকে বিশেষ অর্ডারে তৈরি করা হয়েছিল এই হ্যামার।
প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য বলছে, পদ্মার উপরিতল থেকে নদীর তল পর্যন্ত গভীরতা প্রায় ১৩০ ফুট এবং পানির তোড়ে নদীর তল থেকে মুহূর্তেই যে পরিমাণ মাটি সরে যায়, তা ২০০ ফুটেরও বেশি গভীর খাদ তৈরি করে। অর্থাৎ সেতুর খুঁটি স্থাপন করতে হলে তা কমপক্ষে ৩৩০ ফুট বা ৩৩ তলা ভবনের সমান উচ্চতার খুঁটি হতে হবে। কিন্তু সেতুর চূড়ান্ত নকশায় আরো ৯০ ফুট বাড়িয়ে ৪২০ ফুট গভীরতায় খুঁটিগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
পদ্মা সেতুর নদীতে থাকা ৪০টি পিলারের নিচের পাইল ইস্পাতের এবং মাটিতে থাকা দুটি পিলারের পাইল কংক্রিটের। নদীতে থাকা ৪০টি পাইলের প্রতিটি তিন মিটার ব্যাসার্ধের ইস্পাতের বড় বড় পাইপ, যার ভেতরটা ফাঁপা। এরমধ্যে, ২২টি পিলারের নিচে ইস্পাতের এমন ৬টি করে পাইল এবং বাকি ২২টিতে ৭টি করে পাইল বসানো হয়েছে। আর মাটিতে থাকা দুটি পিলারের নিচের পাইল আছে ৩২টি, যা গর্তের মধ্যে রড-কংক্রিটের ঢালাইয়ের মাধ্যমে করা হয়েছে।
নদীর পানি থেকে প্রায় ১৮ মিটার উঁচুতে হওয়ায় বর্ষা মৌসুম কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পানির উচ্চতা যতই বাড়ুক না কেন, সেতুর নিচ দিয়ে পাঁচতলার সমান উচ্চতার যে কোনো নৌযান সহজেই চলাচল করতে পারবে।
এছাড়া, সেতুর ভেতর দিয়ে রেললাইন থাকায় পদ্মা সেতুটির মূল কাঠামোর উচ্চতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সমানভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। না হলে ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হতো। তাছাড়া, পদ্মানদীর পানির প্রবাহ প্রায়ই পরিবর্তন হয়। একারণে নৌযান চলাচলের পথ সব স্থানেই সমান উচ্চতায় রাখার চেষ্টা রয়েছে সেতুটিতে।
গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে মূলসেতুর পুরো ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এখন দৃশ্যমান। পূর্ণাঙ্গ পদ্মা সেতুতে এখন বাকি শুধু সড়ক ও রেলপথ স্থাপনের কাজ। স্প্যান বসানোর মতো জটিল প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করায় হাফ ছেড়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘এটি অবশ্যই আমাদের জন্য একটি বড় সাফল্য। এখন অন্য যেসব কাজ বাকি রয়েছে সেগুলো সময়সাপেক্ষ হলেও ছোট কাজ এবং জটিল নয়। কিন্তু স্প্যান বসানোর কাজটি ছিল খুবই জটিল বিষয়।’
তিনি জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার চাপ ছিল। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে অনেক বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ঠিকাদার এখনো আসতে না পারায় পুর্ণোদ্যমে কাজ করতে পারছেন না তারা।





