বিশ্বে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

বিশ্বে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ৩১ মে, ২০২১

মারুফ মজুমদার

১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরানের মধ্যে সশস্ত্র সহিংসতা বন্ধে নিয়োজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হয়। গত তিন দশকে যেসব দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা কাজ করেছেন, কর্ম আর দক্ষতায় তা অনন্য হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা অর্জন জাতিসংঘ মিশনে শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে শীর্ষ অবস্থানটি ধরে রাখা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মজ্জা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি স্থাপনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সর্বদাই ছিল গর্বিত অংশীদার। এর আগেও বাংলাদেশ ২০০১, ২০০৫, ২০১১, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনে প্রথম হয়ে এই বিরল কৃতিত্বের অংশীদার হয়েছিল। আইএসপিআর আরো জানায়, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং আন্তরিকতা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতার পৌঁছে দিয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৪০টি দেশের ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৫৭ জন শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে জাতিসংঘের ইতিহাসে বিশ্ব শান্তি রক্ষায় একটি রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৭১ জন, নৌবাহিনী থেকে ৫ হাজার ৯১২ জন, বিমান বাহিনী থেকে ৭ হাজার ১০৬ জন এবং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ১৯ হাজার ৬৬৮ জন বিভিন্ন দেশে মিশনে অংশ নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের ২৭০ জন নারী জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ৫১ জন নারী কর্মকর্তা এবং অন্যান্য পদবির সৈনিক ৬৭ জন, নৌবাহিনীর ছয়জন নারী কর্মকর্তা এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন নারী কর্মকর্তা। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সর্বপ্রথম ২০১০ সালে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে পুলিশের নারী দল পাঠায়।

বর্তমানে ৮টি মিশনে বাংলাদেশের সর্বমোট ৬ হাজার ৮৩৬ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত আছেন। এরমধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ৫ হাজার ২৫৫ জন, নৌবাহিনীর ৩৪৫ জন, বিমানবাহিনীর ৫৮২ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ৬৫৪ জন। হাইতি থেকে পূর্ব তিমুর, লেবানন থেকে ডিআর কঙ্গো পর্যন্ত বিশ্বের সব সংঘাতপূর্ণ এলাকার জনমনে শ্রদ্ধার স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। একসময় যেসব দেশের সাধারণ মানুষ ‘বাংলাদেশ’ শব্দটির সঙ্গেই পরিচিত ছিল না, সেসব দেশে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে অতি প্রিয় একটি দেশ।

বাঙালি ও বাংলা ভাষার পরিচিতি বেড়েছে। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আঞ্চলিক বৈষম্য পেছনে ফেলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা নিজেদের উৎসর্গ করেছেন বিশ্বমানবতার সেবায়। পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, সততা ও মানবিক আচরণের কারণে তারা আজ ওইসব দেশের মানুষের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।

বিশ্বের সংঘাতময় এলাকাগুলোতে শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শান্তিসেনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপদ্রুত এলাকার রাস্তাঘাট মেরামত, চিকিৎসা ও ত্রাণদানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা প্রশংসা কুড়িয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে। প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন সেনা সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সংশ্লিষ্ট রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দুটি সাফল্য অর্জিত হয়েছে। একটি হচ্ছে, এ মিশনে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার পর আবারও প্রথম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী গত ৩১ আগস্ট শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা মোট ছয় হাজার ৭৩১ জনে উন্নীত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের মর্যাদা লাভ করে। দ্বিতীয় সাফল্য হচ্ছে, বাংলাদেশি একজন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার নির্বাচিত হয়েছেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘ মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে সরকার কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; যা পরবর্তী সময়ে সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে নিয়ে এসেছিল। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ৪০০০ সদস্য নিয়ে তৃতীয়, ২০০০ সালে ৫৬০০ সদস্য নিয়ে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে ৬০০০ সদস্য নিয়ে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে শীর্ষে উঠে আসে। ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ২৮ মাসের মধ্যে ২০ মাসই বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল। বর্তমানেও বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানটি ধরে রেখেছে। বিগত আড়াই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৪টি মিশনে শান্তিরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রেখে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে।

আড়াই যুগের বেশি সময় ধরে বিশ্বের ৪০টি দেশের ৫৪টি মিশনে শান্তি রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রেখে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দেশের গৌরব বাড়িয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে গত মে মাস পর্যন্ত জীবন দিতে হয়েছে ১৫৩ জনকে। আহত হয়েছেন ২২৯ জন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ২১৯ জন। নিহতদের তালিকায় রয়েছেন সেনাবাহিনীর ১২২ জন, নৌবাহিনীর চারজন, বিমানবাহিনীর পাঁচজন এবং পুলিশের  ২২ জন।

আইএসপিআরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, ১৯৮৯ সালে ইরাক-ইরানে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে ১৫ জন বাংলাদেশির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। এরপর গত আড়াই যুগে প্রায় এক লাখ ৭১ হাজার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন দেশে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী এই মিশনে দায়িত্ব পালন করে আসছে ১৯৯৩ সাল থেকে। বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা এই মিশনে অংশ নিচ্ছেন ১৯৮৯ সাল থেকে।জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের প্রধান জ্যঁ পিয়েরে ল্যাক্রুয়ার নেতৃত্বে গত বছর পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পুলিশ সদর দফতর পরিদর্শন করেন। এ সময় মিশন প্রধান বলেন, সংঘাতপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পুলিশ শান্তিরক্ষায় অনন্য অবদান রাখছেন।

এ ছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ১২২ দেশের পুলিশ, সেনা এবং বেসামরিক কর্মকর্তারা অবদান রাখছেন। অংশগ্রহণের এই বিশাল মাত্রা শান্তিরক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশ্ববাসীর তাগিদবোধকে প্রতিফলন করে। দেশের প্রায় দুই হাজার নারী শান্তিরক্ষী এরই মধ্যে বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ দেশে সাফল্যের সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করেছেন।

বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ছয়জন জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে আমাদের অংশ নেওয়ার কারণে বাংলাদেশ, বাঙালি ও বাংলা ভাষা অনেক দেশে পরিচিত হয়েছে এবং মর্যাদা পেয়েছে। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত না হতো তাহলে এই কৃতিত্ব অর্জন সম্ভব হতো না। পাকিস্তান নামের একটি রাষ্ট্রে এটি বাঙালিদের নিজস্ব পরিচয়ের বাইরে সীমিত অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেত। শান্তি রক্ষা মিশনে সাফল্যের মূলে রয়েছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর শৃঙ্খলা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ ও যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি।

১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অদ্যাবধি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সর্বোচ্চ পেশাদারি মনোভাব, আনুগত্য ও সাহসিকতার সঙ্গে বিশ্ব শান্তি রক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিম্ললে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বিশ্ব শান্তি অন্বেষণে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ১৫৩ জন শান্তিরক্ষী প্রাণ দিয়েছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিকে যেমন রক্ষা করেছে, তেমনি সারা বিশ্বের মানুষের নিকট বাংলাদেশকে করেছে গৌরবান্বিত। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নিরলস অবদান ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ জাতিসংঘের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।জাতিসংঘের ‘শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সাফল্যের মূলে রয়েছে প্রতিটি শান্তিরক্ষীর ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ ও সহনশীল মনোভাব। আমরা আশা করি, জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরো বাড়বে। নেতৃত্বের অবস্থানেও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ভূমিকা বাড়বে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads