সদ্য ঘোষিত ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন এবং অর্থনীতিবিদরা পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি তুললেও সামগ্রিকভাবে বাজেটকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি অর্থনীতির জন্য ঘোষিত বাজেটকে দেশের জন্য কল্যাণকর বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের অনেকেই করোনাকালীন বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, বাজেটে করোনা মোকাবিলা, টিকা প্রদান কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর মূল্যায়নে প্রস্তাবিত বাজেটকে সব দিক বিবেচনায় কল্যাণমুখী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বাজেটে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো আরো সুদৃঢ় করতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ রয়েছে। এজন্য সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য বলে জানান এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। তবে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়করকে বেআইনি উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এফবিসিসিআই সভাপতি।
তিনি বলেন, ‘এর ফলে আগামীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে। ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।’ এ বিষয়টি বাদ দিলে সংগঠনের মূল্যায়নে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি সব দিক বিবেচনায় কল্যাণমুখী।
পোশাক শ্রমিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র মতে, সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেট ইতিবাচক। একই সঙ্গে বাজেটে বিশাল অঙ্কের এই অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ব্যাহত হবে না বলে জানিয়েছেন, সংগঠনের সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে কোনো প্রভাব পড়বে। বিদেশি উৎস থেকেও ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে। এই প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে হবে।’ তবে বাজেটে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তার প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ করেন বিজিএমইএ সভাপতি।
জনগণের স্থিতিশীল জীবন ও জীবিকার দিকে মনোযোগ দেওয়ার উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলে মনে করছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এই বাজেট অনেক দিক থেকে সাহসী ও অগ্রগামী।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) বাজেটে নেওয়া কিছু পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব প্রদান, ভ্যাট সংক্রান্ত জরিমানা দুবার থেকে কমিয়ে একবার করা, নির্বাচিত কিছু আইটি খাতে কর অব্যাহতিসহ বেশকিছু খাতে করহার কমিয়ে আনায় সরকারের প্রশংসা করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) প্রস্তাবিত বাজেটে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ শিল্পে (অটোমোবাইল) ২০ বছর, হোম অ্যাপ্লায়েন্স শিল্পে ও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ১০ বছর এবং হালকা প্রকৌশল খাতে যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ১০ বছর কর অব্যাহতি প্রদান করায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে।
মোদ্দাকথা, বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। অন্যদিকে বাজেট সম্পর্কে বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাদের নেতিবাচক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে প্রায় সবাই বিদেশি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি মেটানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে, করোনা থেকে উত্তরণে মানুষের কর্মসংস্থান, টিকা কার্যক্রমসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকার বিষয়েও প্রায় সবাই অভিন্ন মত দিয়েছেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি মনে করে, করোনাভাইরাস মোকাবিলা এবং মহামারী থেকে ফিরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য যে বাজেট প্রয়োজন ছিল, তাও প্রস্তাবিত বাজেটে নেই। তারা বেশিরভাগকে ক্ষেত্রেই বাজেট বাস্তবসম্মত হয়নি বলে মত দেয় সিপিডি। সংস্থাটির নির্বাহি পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাজেটে সামষ্টিক যে কাঠামো অর্থাৎ এখানে রাজস্ব আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগ ইত্যাদির যে কাঠামো দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত হয়নি। একইসঙ্গে, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশ বাড়াতে হবে। এটাও অনেকটা বেশি।’
নতুন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতাভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হলেও সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানসহ দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশের খবরকে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম বাজেটে সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করা থাকবে। এটা নিয়ে অনেক কথা-বার্তা হয়েছে। কিন্তু তা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, যেহেতু করোনা নিয়ন্ত্রণের ওপরই নির্ভর করছে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, তাই বাজেটে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল। কিন্তু সেসবের কিছুই নেই। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহি পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, বাজেটে করোনাকে ফোকাস করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করবো সেই রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। এছাড়া টিকাদান কর্মসূচি নিয়েও সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাজেটে নেই। তিনি বলেন, ‘সরকার মাসে ২৫ লাখ টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এই রেটে টিকা দেওয়া হলে ১২ কোটি লোকের ২৪ কোটি টিকা দিতে ৭ বছর লাগবে। সে হিসেবে দিনে ১ লাখেরও কম লোকে টিকা পাবে। যেখানে দিনে কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ লোককে টিকা দেওয়া দরকার। তাহলে ৫-৬ মাসের মধ্যে টিকা দেওয়া সম্পন্ন হবে। ৭ বছর দীর্ঘসময়। এটা গ্রহণযোগ্য না।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বাস্তবায়ন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সক্ষমতা তৈরি না করে বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. হোসাইন জিল্লুর রহমানের মতে, অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ব্যয় কিভাবে বাড়বে, সেটা বাজেটে অনুপস্থিত। তিনি বলেন, ‘সরকার দেশের জনগণকে যে সেবা দেবে তা নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নয়।’





