দেশে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অনিয়ম। ভুয়া বন্ধকির মাধ্যমে অস্তিত্বহীন ও ঋণ শোধে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া জমি, সরকারি খাসজমি মর্টগেজ রেখে ঋণ দেওয়া, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিতরণ, শ্রেণীকৃত দায় থাকার পরও ত্রুটিপূর্ণ সহায়ক জামানতের বিপরীতে এবং গ্রাহকের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এসব অনিয়ম এবং হয়রানি বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। ফলে ব্যাংকিং খাতে দিনদিন বাড়ছে অনিয়ম।
বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) সবশেষে প্রকাশিত অডিট রিপোর্টে ব্যাংকিং খাতে গত ৯ বছরে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে এ ব্যাংকিং খাতে ১১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। ২০১৩ সালে যা ছিল ৬৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ৯ বছরে ব্যাংক খাতে আর্থিক অনিয়মের বেড়েছে ১৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সিএজি-এর গত চার বছরের (২০১৮-২০২১) অডিট রিপোর্টে মোট ৫৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩১ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া সরকারি অর্থের অনিয়মের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশই ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংকে অনিয়ম তখনই বেশি হয়, যখন ব্যাংক কর্মকর্তারা দুর্নীতি করতে উৎসাহ পান। অথবা অনিয়ম করলে শাস্তি হয় না।’ তার মতে, অনেক সময় প্রভাবশালীদের চাপে পড়েও অনিয়মে বাধ্য হন কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রভাবশালীরা চাপ দিলেও অনিয়ম করে ঋণ দেওয়া ব্যাংক কর্মকর্তাদের উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম বন্ধে দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সবার। সিএজি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সবশেষ পার্লামেন্টেও এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেও আইনের যথাযথ প্রতিপালন না হওয়াতে অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।’ ২০২১ সালের সিএজির রিপোর্টের তথ্য বলছে, ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের পরিমাণ ১০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের রিপোর্টে চিহ্নিত করা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছিল ৮ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ঋণ ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণহীন এলাকার বাইরে তড়িঘড়ি করে ঋণ মঞ্জুর, শাখার আপত্তি উপেক্ষা ও বন্ধকি সম্পত্তি মূল্যায়ন ছাড়া ঋণ ইস্যু করা হয়েছে। অর্থ্যাৎ, অধিকাংশ অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নীতিমালা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন, আর্থিক বিধিবিধান ও সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ের আদেশও অমান্য করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোন কোন খাতে অনিয়ম হচ্ছে তা সিএজি’র রিপোর্টে বিস্তারিত রয়েছে। সুতরাং অনিয়মের ক্ষেত্র যেহেতু চিহ্নিত করা আছে, তাই এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অনিয়মের সঙ্গে দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনার সংস্কৃতি আর্থিক খাতে অনিয়ম বাড়াতে সহায়তা করছে। ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম বৃদ্ধির প্রথম কারণ হচ্ছে, আগের অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া।’
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও এর কারণ চিহ্নিত করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত রিপোর্টে অনিয়মের পেছনে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যেকার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকেও দায়ী করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ শাখা ব্যবস্থাপকদের অতিমাত্রায় ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয় যা আগ্রাসী ও বিবেকবর্জিত ব্যাংকিং-এর দিকে চালিত করে।
টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ ও তা বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। যাতে বলা হয়েছে, কোনো নীতি প্রণয়নের পূর্বে এর প্রভাব কী হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংকের তা গবেষণার মাধ্যমে দেখা উচিত, যাতে বার বার নীতি পরিবর্তন করতে না হয়। ব্যাংকভিত্তিক ঋণ পুনঃতফসিলের অবস্থা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিস্তারিত ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ রিপোর্টিং সিস্টেম থাকা উচিত। একক বৃহত্তম ঋণ সীমা নীতিমালায় একক বৃহত্তম ঋণ গ্রহীতার ক্ষেত্রে ২৫%-এর বেশি ঋণ প্রদানে যে ব্যতিক্রমগুলো রাখা হয়েছে তার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বর্তমানে ৫৬টি ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে।
অপর একটি গবেষণায় ব্যাংকিং খাতের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ, ব্যাংকসমূহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকসমূহের অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ, স্বাধীনতায় ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আইনগত বাধা, তথ্যের ঘাটতির কারণে তদারকি সংস্থা কর্তৃক দায়ী ব্যাংককে অব্যাহতি প্রদান, অনিয়ন্ত্রিত বাজার শৃঙ্খলা, ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, দেশে বা বৈদেশিক কার্যক্রমে সমানভাবে প্রবিধান মেনে চলা হচ্ছে কি না এবং ব্যাংকিং খাতের ওপর অ-আর্থিক কার্যক্রমের ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়গুলো সার্বিকভাবে তদারকি না করা ইত্যাদি।





