সারা দেশে বোরোর বাম্পার ফলনেও নাখোশ কৃষক। ধান উৎপাদনে খরচ, কাটার মজুরি ও বাকি সব খরচ দিয়ে আর লাভ থাকছে না। এর মধ্যে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। সরকারের নির্ধারিত মূল্যেও কৃষকদের পোষাচ্ছে না। যদিও ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সব খরচ যে কোনো মূল্যে মেটাতে হবে তাদের। আর এর জন্য ধান বেচতে হবে। সব মিলিয়ে ঈদুল ফিতরের আগে সারা দেশের কৃষকরা জানাচ্ছেন তাদের এবার সব খরচ মিটিয়ে লাভ হবে না। এসবের মাঝেই কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মাঝে কষ্টের খবর— কৃষকের জন্য সরকারের দেওয়া ভর্তুকির পুরো অর্থ খরচ হয় না। অনেকে এটাকে সংশ্লিষ্ট সব দফতরের সমন্বয়হীনতা হিসেবে দেখছেন।
এর মধ্যে আবারো দাবি উঠেছে কৃষিবান্ধব বাজেট ঘোষণার। অনেকে বলছেন কৃষিসংশ্লিষ্টরা যেন তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। কোনোভাবে যেন মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা না লুটতে পারে। আর এর জন্য সরকারকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ফসল বিশেষ করে বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য ও কৃষি নিয়ে এমনতর আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে কৃষি অর্থনীতিবিদরা সরকারি ক্রয় বাড়ানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি খরচ কমাতে কৃষককে নানা প্রণোদনা দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
চলতি অর্থবছরে বাজেটে কৃষিতে ভর্তুকির জন্য নয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে সরকার। আগের বছরেও বরাদ্দ ছিল সমপরিমাণ। তবে পুরো টাকা খরচও করতে পারে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ। খোদ কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক জানান, কৃষি ভর্তুকির তিন হাজার কোটি টাকার মতো অব্যবহূত থাকছে।
জানা যায়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটে কৃষিখাতে সরকারের বিনিয়োগ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের সঠিক ব্যবহার হলে কৃষকের খরচ কমত বলে মনে করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এ সভাপতির ভাষ্য, দেখা যায় বাজেট আছে কিন্তু সে টাকা খরচ হয় না। দেখা যায় যেখানে খরচ করা দরকার সেখানে হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই খরচের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, কৃষিখাতে অর্জন ধরে রাখতে নিশ্চিত করা জরুরি যেন কৃষি ভর্তুকি হ্রাস না পায় এবং একইসঙ্গে যেন ভর্তুকি বৈষম্য হ্রাস পায়।
এদিকে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বিসেফ ফাউন্ডেশনের সহসাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক বলেন, ‘কৃষক জানে না কোথায় ভর্তুকি। আউশ মৌসুমে কিছু প্রণোদনা প্রত্যক্ষভাবে যায় কৃষকের কাছে। এর ফলাফল কৃষক পাচ্ছেন তেমনি আউশ চাষে জমিও বাড়ছে।’ অধ্যাপক রেজাউল বলেন, ‘কৃষি পণ্য পরিবহনে প্রণোদনা এবং গণপরিবহনে কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।’
কৃষকের খরচ কমিয়ে আনা এবং উৎপাদন বাড়াতে প্রতি বছরই বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। কৃষি উপকরণ, বিশেষ করে সার, ডিজেল, বিদ্যুতে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানো হয়েছে। কৃষি যন্ত্র কেনাও অঞ্চলভেদে ৫০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত কৃষকদের কাছে এই ভর্তুকির অর্থ পৌঁছায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাই ভর্তুকিতে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রকৃত কৃষকদের হাতে পৌঁছানোরও উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) শামসুল আলম বলেন, ‘অনেকে বলে কৃষিতে বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। আসলে প্রয়োজন যে বাজেট দেওয়া হয় সেটা খরচের সক্ষমতা তৈরি। বাজেট বাড়ানো সমস্যা নয় সমস্যা দক্ষতা বাড়ানো।’
একই মত পোষণ করে কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভর্তুকির অর্থ যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করা হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ভর্তুকি আরো বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য খাতেও ভর্তুকির জন্য অর্থ বেশি পরিমাণে বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
কৃষির আধুনিকায়নে যান্ত্রিকীকরণে নজর দেওয়ার কথাও জানান মন্ত্রী, ‘কৃষিকাজে কৃষি শ্রমিক এখন একটা বড় সমস্যা। এর একমাত্র সমাধান কৃষির যান্ত্রিকীকরণ। থেকে যাওয়া অর্থ এখন থেকে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে সরকারের।’
ভর্তুকির এমন কাণ্ডের মধ্যেও সারা দেশের কৃষকরা জানাচ্ছেন বোরো নিয়ে হেনস্তার কথা। আমাদের বরিশাল প্রতিনিধি জানান, সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শুরুর পরেও হাসি নেই দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের মুখে। এই অঞ্চলে এবার প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন বোরো ফসল উৎপাদন হলেও সরকার সংগ্রহ করছে মাত্র ২১ হাজার ৪৯ টন। যার মধ্যে ধানের পরিমাণ মাত্র ৫ হাজার ১৯ টন। ফলে বাকি ৬ লক্ষাধিক টন ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে এখনো শঙ্কিত কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরিশাল কার্যালয় (খামারবাড়ি) সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের থেকে এ বছর বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন বেশি হয়েছে। বিগত ২০১৭-১৮ সনে রবি মৌসুমে ১ লাখ ৬৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৭ লাখ ৮৭৫ দশমিক ৭৮ টন ধান। এবার তার থেকে কম অর্থাৎ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪২ টন। এরই মধ্যে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমি থেকে ফসল কর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত ধান উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৭৩৯ দশমিক ১ টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক তাওফিকুল আলম বলেন, ছয় জেলায় আমাদের ১০ টাকা মূল্যের কার্ডধারী ১২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৫ জন কৃষক রয়েছেন। যারা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি রবি মৌসুমে বোরো ফসল আবাদ করে থাকেন। কার্ডধারী কৃষকরাই সরাসরি সরকারের কাছে ধান ও চাল বিক্রি করতে পারবেন। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চল ধান উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময়। কিন্তু মূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধান চাষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। সরকারের ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কম হওয়ায় মিলমালিক বা গ্রামের পাইকারদের কাছে কম মূল্যে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছে।
এদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক রেজা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী আমরা কৃষকদের কাছ থেকে ১৪ ভাগ আর্দ্রতার ধান ক্রয় করছি। প্রতিমণ ধানের মূল্য দেওয়া হচ্ছে এক হাজার চল্লিশ টাকা। সে হিসেবে কৃষকরা প্রতি কেজি ধানের মূল্য পাচ্ছে ২৬ টাকা। আর প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের মূল্য দেওয়া হচ্ছে ৩৬ টাকা। তিনি বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা থেকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে মোট ৫ হাজার ১৯ টন ধান সংগ্রহ করা হবে। এর পাশাপাশি ১৬ হাজার ৩০ টন চাল সংগ্রহ করবেন তারা। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭০ টন ধান বিক্রি করতে পারবেন।
বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, প্রতি কৃষকের কাছ থেকে যাতে ২০ মণ করে ধান সরকারিভাবে ক্রয় করা হয় সে জন্য আমি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। পাশাপাশি সরকারি ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা আরো বেশি নির্ধারণ করার জন্যও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রয়োজন কৃষকবান্ধব বাজেট : বোরো ধানের দাম নিয়ে সারা দেশে চলছে হাহাকার। এ হাহাকারের মধ্যে নতুন করে দাবি উঠেছে কৃষিবান্ধব বাজেটের। কারণ কৃষক সংকটে পড়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য। যার প্রমাণ এবার বোরো ধান সংগ্রহেও মিলেছে। জানা যায়, সরকারকে ধান ও চাল সরবরাহ করে মিলমালিক ও ব্যবসায়ীরা। তারা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে মিলে চাল তৈরি করে সরকারি গুদামে বিক্রি করে। ধান ও চালের দাম নির্ধারণে বড় ধরনের পার্থক্য রেখে এমনিতেই মিলমালিকদের বড় মুনাফার সুযোগ করে দেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তার ওপর বাজার থেকে সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেকেরও কমে ধান কিনে চাল বানিয়ে সরকারকে সরবরাহ করে মুনাফার অঙ্ক কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেবে মিলমালিকরা।
এদিকে অনেকেই বলছেন, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের হাতে বাজার ছেড়ে দিয়ে কখনোই তা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে সিংহভাগ ফসল ক্রয়, গুদামজাত ও বিক্রির ব্যবস্থা ছাড়া মূল্য সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কৃষি উপকরণের পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলে ভর্তুকির ব্যবস্থা করা না হলে খুব বেশি দিন কৃষকের উৎসাহ ধরে রাখা যাবে না। এজন্য সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনা, বাজেট ও ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো জরুরি। তবে গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা না থাকায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ থাকছে না।
জানা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছর কৃষি উৎপাদনে মোট ব্যয়ের ৩১ শতাংশ সরকার বহন করলেও এখন তা ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কৃষিতে ভর্তুকির হারও এ খাতের জিডিপির দুই শতাংশের কম। এ কারণেই উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন সহায়ক উপাদানের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত ফসলের প্রকৃত মূল্য না পাওয়ায় বছর বছর লোকসান দিচ্ছে কৃষক। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরেও মোট উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২২.৫ শতাংশ বরাদ্দ কৃষি খাত পেয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও এর সিংহভাগই ব্যয় হচ্ছে অনুন্নয়ন খাতে।
কৃষি বাজেট কমাতে গিয়ে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে এ খাতের উন্নয়নে। দুই দশকের ব্যবধানে উন্নয়ন বাজেটে কৃষি খাতের প্রাপ্তি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ১৯৭৭ সালে উন্নয়ন বাজেটের ২৩ শতাংশ কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে এ খাতের বরাদ্দ কমতে কমতে ২-৩ শতাংশে নেমে এসেছিল। বর্তমানে কিছুটা বাড়লেও তা ৮ শতাংশ অতিক্রম করছে না।
কৃষি বাজেটের মতোই এ খাতে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। স্বাধীনতার পর সরকারিভাবে স্বল্পমূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল। সেচ ব্যবস্থাও পরিচালিত হতো সরকারি তত্ত্বাবধানে।
অন্যদিকে প্রতি বছরই কৃষিকাজে ব্যবহূত উপকরণের দাম বাড়ছে। একইভাবে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। কৃষকের জমিতে উৎপাদিত সব জিনিসের দামই বাজারে আকাশছোঁয়া। কিন্তু ক্রেতারা উচ্চমূল্যে এসব জিনিস কিনলেও ন্যায্যমূল্য পায় না কৃষক। মধ্যস্বত্বভোগীরাই কৃষকদের ঠকিয়ে কম দামে কিনে বেশি দমে বাজারে বিক্রি করে লাভবান হয়। উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ হচ্ছে কৃষক।





