ব্যবসার খবর

ভার্চুয়াল মুদ্রার নানা ঝুঁকি

  • মোহসিন কবির
  • প্রকাশিত ৩১ জুলাই, ২০২১

দেশের আর্থিক খাতে সম্প্রতি আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে ভার্চুয়াল মুদ্রা ক্রিপটোকারেন্সির বিষয়টি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা সিআইডিকে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি চিঠির সূত্র ধরে বিতর্ক সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে একটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বৃহস্পতিবারের ওই সার্কুলারে আবারো ক্রিপটোকারেন্সিকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এই ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা দিয়ে এর ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে কৃত্রিম ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেন ও বাণিজ্য নিয়ে সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়।

এদিকে, ভার্চুয়াল এই পেমেন্ট পদ্ধতি সম্পর্কে জানা নেই দেশের বেশিরভাগ মানুষেরই। আবার যারা এ সম্পর্কে জানেন, তাদের মধ্যে এই মুদ্রার বৈধতা-অবৈধতা সম্পর্কেও রয়েছে নানা জিজ্ঞাসা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রিপটোকারেন্সি হলো ভার্চুয়াল মানিব্যাগ, যেখানে একজন ব্যক্তি তার অর্থ ভার্চুয়ালি জমা রাখতে পারেন, যার কোনো ফিজিক্যাল অস্তিত্ব নেই। ইন্টারনেটের যেমনিভাবে কোনো নির্দিষ্ট মালিক বা অথরিটি নেই, তেমনি ক্রিপটোকারেন্সিরও কোনো নির্দিষ্ট মালিকানা বা অথরিটি নেই। এ ছাড়া, সাধারণ মুদ্রার মতো এর ভ্যালু নির্ধারণ সম্ভবপর নয়। সবমিলিয়ে এটির মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং অর্থনীতিসহ নানা দিক বিবেচনায় আমরা ক্রিপটোকারেন্সিকে অনুমোদন দিচ্ছি না। কারণ, এর মাধ্যমে আমাদের দেশের অনেক সম্পদ দেশের বাইরে চলে যেতে পারে। ক্রিপটোকারেন্সির মাধ্যমে অনেক অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যেটি এক ধরনের মানি লন্ডারিং। সেটি ঠেকানোই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। সুতরাং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটিকে অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।’ তার মতে, ভবিষ্যতে এই কারেন্সির অনুমোদন দেওয়া হবে কিনা সেটি বলার মতো সময় এখনো আসেনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই যুক্তিকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবিদরাও। তারা মনে করেন, ক্রিপটোকারেন্সির বিষয়টি একটি জটিল প্রক্রিয়া। একইসঙ্গে এটির কিছু ঝুঁকিপূর্ণ দিকও রয়েছে। যে কারণে, এই মুহূর্তে ভার্চুয়াল এই মুদ্রা চালু না করার সিদ্ধান্তটি সঠিক।

এ প্রসঙ্গে যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের হেড অব আইটি সৈয়দ জাহিদ হোসাইন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ইন্টারনেটে সাইবার হামলার একটি ঝুঁকি থাকে। ফলে ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক ধরনের ঝুঁকি থেকে যায়। পাশাপাশি এটির ব্যবহার বোঝার জন্য যে দক্ষতা বা যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা যথেষ্ট না। এ কারণে এটি যদি অনুমোদন দেওয়া হয় অনেকে এর মাধ্যমে প্রতারিত হতে পারেন। যদিও বলে গ্লোবালি এটি নিষিদ্ধ না।’

ক্রিপটোকারেন্সির জন্য ব্লকচেইন নামে একটি নিরাপদ টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অফিসিয়াল যেকোনো একটি প্রজেক্টের জন্য যেমনিভাবে বিভিন্ন ধাপের যে প্রক্রিয়া থাকে ক্রিপটোকারেন্সির বেলায় ব্লকচেইনেও এরকম বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। একজন ব্যক্তি একটি ধাপ সম্পন্ন করা ছাড়া দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করতে পারবেন না। সৈয়দ জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘সবচেয়ে মজার এবং জটিল বিষয় হলো, একটি ব্লকচেইন আইটেমে আরেকটি ব্লকচেইন আইটেম সম্পর্কে কোনো তথ্যই থাকে না। এটি হাইলি সিকিউরড। তাই এখানে নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়, সেই পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে ক্রিপটোকারেন্সির ব্যবহারকারী তার অর্থ বা সম্পদ হারাতে পারেন। আমাদের দেশের লোকজন সেই ধরনের স্মার্ট কিংবা আইটি এক্সপার্ট নয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা মার্কেট গবেষণা ওয়েবসাইট ‘কয়েন মার্কেটক্যাপ’ এর তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে ১০ হাজারেরও বেশি ক্রিপটোকারেন্সি রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন। ২০০৯ সালে চালু হয় এই অনলাইন মুদ্রা। এছাড়া ইথেরিয়াম, বিনান্স কয়েন, ডজকয়েন, ইউএসডি কয়েন, টি-টেথার, রিপল, লিটকয়েন এবং ফেসবুকের নিজস্ব ক্রিপটোকারেন্সি লিব্রা অন্যতম।

ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ক্রিপটোকারেন্সিকে ব্যবহার করছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মুদ্রা এখনো চালু করেনি কোনো দেশই। সম্প্রতি মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরে দ্বিতীয় বৈধ মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েন চালুর প্রস্তাব করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। আর তা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ডিজিটাল মুদ্রা বিটকয়েন চালুর ইতিহাস গড়বে এল সালভাদর।

তবে বিশ্বব্যাপী এই মুদ্রার প্রচলন বাড়তে থাকায় বাংলাদেশকে এ নিয়ে এখন থেকেই ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তিবিদরা। তাদের মতে, বর্তমানে আমাদের দেশে যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছেন, অনেক কোম্পানি তাদেরকে ক্রিপটোকারেন্সির মাধ্যমে পেমেন্ট দিতে চায়। যেহেতু আমাদের দেশে এটি অবৈধ সে কারণে এই অফারটি গ্রহণ করতে না পারায় ওই ফ্রিল্যান্সার হয়তো তার কাজটি হারাতে পারেন। এতে মার্কেট ছোট হচ্ছে আমাদের। তাই এটিকে যদি  ডেভেলপ করা না যায় তাহলে আউটসোর্সিংয়ের অনেক বাজার হয়তো হারাতে হবে।

সৈয়দ জাহিদ হোসাইনের মতে, হয়তো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিপটোকারেন্সির ব্যবহার অনেক বেড়ে যাবে। তাই এটির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেওয়া অসম্ভব। এজন্য এখন থেকেই এটি নিয়ে গবেষণা এবং পলিসি তৈরির কাজ করা দরকার। এর ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যাতে একজন ব্যক্তি ক্রিপটোকারেন্সি ব্যবহার করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারির মাধ্যমে তা করতে পারেন সেভাবেও করা যেতে পারে।

ধারণা করা হয়, ১৯৯২ সালে জাপানি বিজ্ঞানী সাতোশি নাকামোতো প্রথমে ব্লকচেইন প্রতিষ্ঠা করেন। তার কাছে মনে হলো ই-কমার্সে গ্লোবালি যে কমিউনিকেশন হয়, তাতে বিভিন্ন দেশের কারেন্সি কনভার্সন এবং নানা কারণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তাই যদি এমন একটি ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যেটি নির্দিষ্ট কোনো দেশের না কিন্তু প্রতিটি দেশের অর্থের ভ্যালু এটাতে অ্যাডজাস্ট সম্ভব। সেই ধারণা থেকেই তিনি ক্রিপটোকারেন্সির তৈরি করেন। বর্তমানে অনেক ই-কমার্স সাইট ক্রিপটোকারেন্সিতে লেনদেন করছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads