ভাষা আন্দোলনসহ অধিকার প্রতিষ্ঠার সব রকম ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামেই কুমিল্লা ছিল মুখরিত। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারত বিভাগের মাউন্টব্যাটন পরিকল্পনার পর থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিভিন্ন জল্পনাকল্পনা শুরু হলেও মোটামুটি নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ ঘটে বা ভাষার প্রশ্ন উঠে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও পরিষদের সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব পেশ করলে। দত্তের এই গণতান্ত্রিক বক্তব্য পূর্ববাংলার জনগণকে বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করে বাংলা ভাষার পক্ষে লড়ার জন্য এবং তিনি কুমিল্লাবাসী বলে ওই নায়কসুলভ বক্তব্য কুমিল্লার মানুষকে বাংলা ভাষার প্রশ্নে গভীরভাবে ভাবিত করে। মাতৃভাষার এ দুঃসময়ে সারা দেশে বিক্ষোভ সংঘটিত হওয়ার আগেই কুমিল্লায় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে দুটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমটি হয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের গ্যালারি কক্ষে এবং দ্বিতীয়টি কুমিল্লা টাউন হল ময়দানে। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে ১১ মার্চ সমগ্র পাকিস্তানে হরতাল পালন করা হয়। কুমিল্লায় এই হরতাল উপলক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ইত্যাদি লেখা পোস্টার শহরের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ফয়েজ উল্লাহ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, মুস্তাফিজুর রহমান, বদরুল হুদা চৌধুরী, অবিনাশ সাহা, জিয়াউল হক, এ বি এম মুসা প্রমুখ।
১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরবি হরফে বাংলা লেখার কেন্দ্রীয় সরকারের হীন চক্রান্তের প্রতিবাদে ২৩ ডিসেম্বর কুমিল্লার টাউন হল প্রাঙ্গণে ত্রিপুরা জেলা তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভা হয়। ১৯৫০ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লায় আসেন এবং ভেতর থেকে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। একই বছর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কুমিল্লায় আগমনের পর আওয়ামী মুসলিম লীগ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন জহিরুল হক লাল মিয়া ও আব্দুর রহমান খান। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৫১ সালের ১৬ ও ১৭ মার্চ কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষক সম্মেলনে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার পরিবর্তে উর্দু প্রবর্তনের চেষ্টাকে তীব্রভাবে নিন্দা করেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিটি বাঙালিকে বিদ্রোহ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘বাংলা ভাষা অবহেলিত হইলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রোহ করিব।’
১৯৫২ সালের জানুয়ারি থেকে যুবলীগ দেয়াল লিখন, সড়কের চার মাথায়, তে-মাথায় পথসভা করতে শুরু করে। বন্দিমুক্তি, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদানের দাবিও সামনে আনে। ঢাকার সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি ও আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সভা ও শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলে। কুমিল্লায় এক ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এখানে স্কুল ছাত্রদের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। জর্দার খালি কৌটায় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ কাগজ মুড়িয়ে চাঁদা সংগ্রহ করা হতো এবং তা দিয়ে আন্দোলনের ব্যয় নির্বাহ হতো।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সারা দেশের মতো কুমিল্লায় হরতাল পালিত হয়। সকাল ১০টায় টাউন হল মাঠ থেকে বিশাল মিছিল বের হয়ে রাজগঞ্জ, মোগলটুলী, ফৌজদারি, পুলিশ লাইন, স্টেশন রোড, অশোকতলা, রাণীর বাজারে আসে। এই শোভাযাত্রা মোহাজের কলোনি ঘুরে পাশ দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় কলোনির একদল উর্দুবাসী লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে শোভাযাত্রীদের ওপর আক্রমণ করে। শোভাযাত্রায় হামলার সংবাদ সারা শহরে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। টাউন হলে ছত্রভঙ্গ মিছিল আবার জমায়েত হয়। ঐদিন বিকাল ৫টায় বিশাল জনসভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আব্দুর রহমান আবাদ। এতে হাসান ইমাম রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে বক্তব্য রাখেন। দৈনিক আজাদের এক পাতার একটি বিশেষ সংখ্যা কুমিল্লা এসে পৌঁছে। এর ব্যানার হেডলাইন ছিল-‘মাসুম বাচ্চার রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’।
হরতাল চলাকালে দুপুর দেড়টায় ঢাকা থেকে সাংবাদিক এ বি এম মুসা কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান অতীন্দ্র মোহন রায়কে ঢাকায় গুলিবর্ষণ ও নিহত হবার সংবাদ দেন। বিকেলে ভাষা আন্দোলনের কর্মীরা জড়ো হন অতীন্দ্র মোহন রায়ের বাসভবনে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় সন্ধ্যায় টাউন হল ময়দানে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হবে। কর্মীরা তৎক্ষণাৎ টিনের চোঙা হাতে নিয়ে প্রচারে নেমে পড়েন। দুঘণ্টা প্রচারে টাউন হল মাঠে প্রায় তিন হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। এই সভায় নুরুল আমিন মন্ত্রিসভার পদত্যাগ, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদান, মোহাজেরদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করা হয়। অধ্যাপক শওকত আলী, হাসান ইমাম, আব্দুল গনি, আবুল হোসেন প্রমুখ বক্তা পুলিশি জুলুমের তীব্র নিন্দা করেন। অপর এক প্রস্তাবে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার পদত্যাগ এবং চিফ সেক্রেটারি ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরায়েশীর অন্যত্র অপসারণ দাবি করা হয়।
ভাষা আন্দোলনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভূমিকা ছিল উজ্জ্বল। এ আন্দোলনে জেলা ও কলেজ পর্যায়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জিয়াউল হক, আলী আক্কাস, আনোয়ার উল্লাহ, আমীরুল ইসলাম প্রমুখ। ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক আজমউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আব্দুল খায়ের ও সালাউদ্দিন ভাষা আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাছাড়া স্কুলপর্যায়ে নেতৃত্বে ছিলেন এ টি এম মেহেদী। কুমিল্লায় প্রথম শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। পরে ১৯৬২ সালে প্রশাসনিক ও কলেজ কর্তৃপক্ষের বাধা সত্ত্বেও সাইকেলস্ট্যান্ড স্থানে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়।





