বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকেই বরিশাল ছিল আন্দোলনমুখর। সভা-সমাবেশ, মিছিল মিটিংয়ের মাধ্যমে আন্দোলনকে বেগবান করার পাশাপাশি শহর-গ্রামে জনমত তৈরি শুরু করে এখানকার ছাত্রসমাজ। এ বছরের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয় এবং সচিবালয় ঘেরাও করা হয়। পুলিশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বরিশালের কাজী গোলাম মাহবুব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমকে গ্রেপ্তার করে। ঢাকার সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ওইদিন বরিশালের স্কুল-কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। এরপর ৮১ সদস্য বিশিষ্ট বৃহত্তর বরিশাল রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।
১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার এক জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল- প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’। ২৮ সদস্য বিশিষ্ট এই কর্মপরিষদের পাঁচজন ছিলেন বৃহত্তর বরিশাল জেলার। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বানে বরিশালে ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের প্রস্তুতি চলে। আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য ‘পতাকা দিবস’ পালন শুরু হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এর নামে পতাকা ও ব্যাজ বিতরণ এবং পোস্টারিং চলতে থাকে। কর্মীরা টিনের চোঙা নিয়ে রাস্তায় প্রচার কাজ চালায়। এই চোঙা ফোকার অন্যতম নায়ক ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিখিল সেন।
২১ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর বরিশালে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। এদিন ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ বরিশালে পৌঁছলে রাত ৯টায় মিছিল বের হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা থেকে স্টিমারে আগত সৈয়দ শামসুল হুদা একটি টেলিগ্রাম সংবাদপত্র নিয়ে আসেন যাতে ঢাকায় ছাত্র হত্যার সংবাদ ছিল। অশ্বিনী কুমার হলের সামনে ভোর থেকে ছাত্র-জনতার স্রোত নামে। গ্রাম থেকে আসা জনতা ছাড়াও শত শত মহিলা সেদিন আওয়ামী লীগের এমপিএ মিসেস হামিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রথম শোভাযাত্রা করে। বরিশালের অন্যান্য মহিলা ভাষাসৈনিক হলেন হোসনে আরা নিরু, মঞ্জুশ্রী, মাহে নূর বেগম, রাণী ভট্টাচার্য প্রমুখ। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন মেয়েরা, তারপর সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
২৪ ফেব্রুয়ারি অশ্বিনী কুমার হলের সামনে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন আবুল হাশেম, জাহিদ হোসেন জাহাঙ্গীর, মোহাম্মদ সুলতান প্রমুখ। এদিন শহীদ মিনারে শোকের প্রতীক কালো পতাকা এবং সংগ্রামের প্রতীক লাল পতাকা উত্তোলন করা হয়। এর আগে মোহাম্মদ সুলতান তার দোকানের ১০ গজ সাদা কাগড় দিয়ে শহীদ মিনার মুড়ে দেন। পুষ্পস্তবক দিয়ে আবুল হাশেম শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। অবশ্য ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতের অন্ধকারে সরকারি নির্দেশে পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। তবে পর্যায়ক্রমে আন্দোলন চলতে থাকে। মিছিলে সুরস্রষ্টা আলতাফ মাহমুদ গান গাইতেন।
এরপর ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অবশেষে নির্বাচন দিতে বাধ্য হলো পাকিস্তান সরকার। এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট এই নির্বাচনে ৯টি আসন বাদে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে। তখন প্রাদেশিক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বরিশালের গৌরব এ কে ফজলুল হক আইন পরিষদে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা, শহীদ মিনার নির্মাণ এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অনুমোদন দেন। পরবর্তীকালে ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষাবধি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়। তাই এক কথায় বলা যায় যে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা আন্দোলন ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত চলেছে। আর শেষাবধি ভাষা আন্দোলনে বরিশাল জেলার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।





