১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ছিল খুবই কম। সেই সময় মুসলিম লীগ ছিল ক্ষমতাসীন দল। প্রধানত আওয়ামী লীগ, জাতীয় কংগ্রেস এবং পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি এই আন্দোলনের সমর্থনে কাজ করেছিল। ‘জাতীয় কংগ্রেস’ ছিল এসময়ে কেবল বিরোধী দলীয় দল। বিধান সভা ও গণপরিষদ উভয় স্থানে তারা বাংলা ভাষা চাহিদার দাবি যুক্তিসহ উল্লেখ করেন। এই দাবির ফলে জাতীয় কংগ্রেসের কিছু সদস্যদের ভারতীয় চর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং তারা সরকার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন। অনেক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের একজনকে কারাগারের ভেতরে হত্যাও করা হয়।
ওই সময়ে যাত্রা শুরু করা ‘আওয়ামী লীগ’ বাংলা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান আন্দোলনে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে গঠিত ‘কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’-এর সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাদের নেতাকেও কারা হেফাজতে অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়। পাশাপাশি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলা ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত সময়ে সরকার এই আন্দোলনকে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’র একটি অন্তর্ঘাত হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের মতে, স্থানীয় কমিউনিস্টরা ভারতীয় কমিউনিস্টদের দ্বারা চক্রান্তের শিকার হয়েছিল। সমগ্র আন্দোলনের সময় কমিউনিস্টদের কার্যক্রম নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ১৯৪৭ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের একটি ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দিন মজলিস, যে কিনা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি তোলে এবং বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু করে। সেই তমুদ্দিন মজলিস কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, বাংলা ভাষা আন্দোলনে তারা বাধার সৃষ্টি করছে এবং তাদের দুর্বলতার কারণে এই আন্দোলনে কোনো ধরনের অবদান রাখতে পারছে না। ১৯৪৮ সালে ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা মোজাফফর আহমেদ ঢাকা সফরে এলে তমুদ্দিন মজলিস তাকে বাংলা ভাষা আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান জানান। কিন্তু মোজাফফর আহমেদ তাতে সাড়া না দিয়ে বলেন যে, সরকারের পক্ষ থেকে একে ভারত সমর্থিত আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় বিধায় তিনি এটি এড়ানোর জন্যে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।
ঠিক এই সময়ে অর্থাৎ ১৯৫২ সাল থেকে সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তাদের প্রকাশ্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের প্রায়ই গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হতো, এমনকী তাদের কারাগারের ভেতরে হত্যাও করা হয়েছে। এ কথা সত্য যে, বাংলা এবং উর্দুকে সমান মর্যাদা দেওয়ার প্রথম প্রস্তাবটি কমিউনিস্টরাই দিয়েছিল। তবে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরো পাঁচটি বছর। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সংবিধান উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করতে বাধ্য হয়।





