ভেজাল ধরতে এবার নামীদামি কারখানায় অভিযান

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

ভেজাল ধরতে এবার নামীদামি কারখানায় অভিযান

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২৮ জুন, ২০১৯

বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন সরকার ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যায়নি আজো। অথচ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কাজ করে সরকারের বেশ কিছু সংস্থা। শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন-এমনকি এলিট ফোর্স র্যাবও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে থাকে। ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোও সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। 

তবে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার লোভে কোনো সংস্থাকেই পাত্তা দিচ্ছে না। দিনের পর দিন ভেজাল পণ্য উৎপাদন, বাজারজাত ও বিপণন করছে তারা। সম্প্রতি বিভিন্ন পরীক্ষায় নামীদামি কোম্পানিগুলোর পণ্যেও ভেজাল পাওয়া যায়।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএসটিআই, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভোক্তা অধিকার সংক্ষরণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বছরজুড়ে ভেজালবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও এলিট ফোর্স র্যাব নির্বাহী হাকিমের মাধ্যমে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারে। তবে সরকারের বেশির ভাগ সংস্থা কেবল বিপণন পর্যায়ে ভেজাল ধরতে ব্যস্ত। এ ছাড়া নামীদামি কোম্পানিগুলোর নিত্যপণ্য খুব বেশি সন্দেহে রাখা হয় না। কেবল খোলা জিনিস যেমন মাছ, ফল, সবজিসহ কিছু নিত্যপণ্যে নজর ছিল।

কিন্তু সম্প্রতি বিএসটিআই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় নামীদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্যাকেটজাত নানা পণ্যে বড় ধরনের ভেজাল পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি। এতে দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বাড়ছে উৎকণ্ঠা। ফলে সরকারের সব সংস্থা এবার নামীদামি কোম্পানিগুলোর কারখানা সরাসরি পরিদর্শনে যেতে চায়। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া গত দুই দিনে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা যৌথভাবে এবং আলাদাভাবে বৈঠক করে কর্মপন্থা ঠিক করেছে।

এ ছাড়া আইনে বিএসটিআইকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যবহার করছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে আরো বেশি কার্যকর করতে যা যা করা দরকার করা হবে। সরকার মনে করছে, সাধারণ মানুষকে ভেজালের ব্যাপারে সচেতন করার পাশপাশি আইনের প্রয়োগ জরুরি। আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া অসাধু ব্যবসায়ীচক্রকে ঠেকানো যাবে না। যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ করে এবং ভেজাল পণ্য উৎপাদনের বিষয় ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচার করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’-এর সংযোজন কার্যক্রম তদারক করা হবে। তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শনে যাবেন সরকারের পরিদর্শন দলের সদস্যরা। ভোজ্য তেলে ভিটামিন ‘এ’ সংযোজনের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আগামী বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।

আরো জানা গেছে, যেসব কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান নিম্ন মানের সামগ্রী উৎপাদন করে তাদের কারখানা নিয়মিত পরিদর্শন করা হবে। ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন মোতাবেক জেল, জরিমানা, কারখানা সিলগালা করা হবে। প্রয়োজনে উৎপাদন-সংক্রান্ত সনদ বাতিল করা হবে।

সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থা যাতে কোনো কোম্পানি পণ্যের কাঁচামাল আনতে না পারে-সেটি কীভাবে নিশ্চিত করা যায় তা নিয়েও ভাবছে সরকার। প্রয়োজনে কাঁচামাল পরীক্ষা করা হবে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের এক পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের শতাধিক পণ্যের নমুনায় মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপাদন পাওয়া গেছে। এর আগে বিএসটিআই ভেজালের অভিযোগে ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নিতে নির্দেশ দেয়। তবে এরপর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে পণ্যগুলো বাজারে বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।

বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাতটি প্যাকেটজাত দুধের নমুনা পরীক্ষা করে সেগুলোতে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহূত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘি, ফলের জুস, মরিচ ও হলুদের গুঁড়া, পাম অয়েল, সরিষার তেল ও সয়াবিন তেলের নমুনা পরীক্ষা করে এগুলোর বেশির ভাগই মানহীন প্রতীয়মান হয়েছে পরীক্ষায়। এসব খাদ্যপণ্য বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারসহ অনুষদের একাধিক ল্যাবরেটরিতে জাতীয় মান পরীক্ষণ সংস্থা বিএসটিআইয়ের মানদণ্ডে পরীক্ষা করে এই ফল পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের গবেষকরা।

জানতে চাইলে শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম বলেন, ভেজাল পুরো জাতির জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেও এর থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। এখন দেখা যাচ্ছে, নামীদামি কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন পণ্যেও ভেজাল। তাই আমাদের নজর থাকবে, এসব কোম্পানির পণ্যের মান নিশ্চিত করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের পরীক্ষা সম্পর্কে বলেন, আমি প্রতিবেদনটি দেখিনি। তবে আমাদের বিএসটিআই এখন আন্তর্জাতিক মানের। আমি সংশ্লিষ্ট গবেষকদের আহ্বান করব, তাদের প্রতিবেদনটি বিএসটিআইকে দিতে। যাতে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads