সারা দেশ

ভোগাই ও চেল্লাখালি থেকে বালু উত্তোলন, ভাঙ্গনের মুখে নদী

  • শেরপুর প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার নদী ভোগাই ও চেল্লাখালী থেকে বেপরোয়াভাবে চলছে বালু উত্তোলন। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে প্রানবৈচিত্র হুমকির সম্মুখিন হয়ে পরেছে। জানা গেছে, বালু দস্যুরা  নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে অবাধে বালু উত্তোলন করে আসছে। ভোগাই ও চেল্লাখালি সেতুর দু'পাশের তীর ঘেষে অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে সেতু ২টি হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া সেতুর উপর দিয়ে ভারি বালুবাহী ট্রাক দিনেরাতে চলাচলের কারনে যে কোন সময় সেতুগুলো ধ্বসে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। দ্রুত সেতুর পাশ থেকে বালু উত্তোলন ও সেতুর উপর দিয়ে ভারি ট্রাক চলাচল বন্ধের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সড়ক ও জনপদ বিভাগের পক্ষ থেকে সেতুর দুপাশে সাইনবোর্ডে ১০ মেট্রিকটনের অধিক ওজনের মালামাল পরিবহনে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু ট্রাকচালকরা বিধিনিষেধের প্রতি তোয়াক্কা না করে ৫০ থেকে ৬০ মেট্রিকটন ওজনের বালু বোঝাই ট্রাক অবাধে যাতায়াত করে আসছে। দিনেরাতে শতশত অতিরিক্ত বালু বুঝাই ট্রাক সেতুর উপর দিয়ে নেয়া হচ্ছে। এতে সেতু ২টি হুমকির সম্মুখিন। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত ভারি বালু বোঝাই শতশত ট্রাক বালু অবাধে যাতায়াতের কারনে নদীর পারের রাস্তাগুলো ডেবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পরেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোগাই নদীর হাতিপাগার, কালাকুমা, নাকুগাঁও তাড়ানি এলাকায় অর্ধশতাধিক চেল্লাখালি নদীর বিভিন্ন স্থানে ৩০/৩৫ টি শ্যালোইঞ্জিন চালিত ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে ২ শতাধিক বালু শ্রমিক  বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন করে আসছেন। দুইটি নদীর ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এবং ভারত সীমান্তের জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত বসানো হয়েছে বালু উত্তোলন যন্ত্র। নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলনের কারনে বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে নদীভাঙ্গন।

স্থানীয়রা জানান, বালুদস্যুরা নদীর পার কেটে ও নদীর তলদেশের ২৫/৩০ফুট নীচ থেকে ড্রেজারমেশিনে অবাধে বালু উত্তোলন করায় নদীগুলোও নদীর পার ক্ষতবিক্ষত হয়ে পরেছে। খানাখন্দের সৃষ্টি হয়ে চোরা বালিতে পরিনত হয়েছে নদীর তলদেশ। বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। এতে নাকুগাঁও স্থলবন্দর, নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামও বাজার হুমকির সম্মুখিন। নদী ভাঙ্গন রোধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে বালু উত্তোলন যন্ত্র ধ্বংস ও বালু দস্যুদের জরিমানাও করা হয়েছে। কিন্তু নদীর পার ভেঙ্গে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।

জানা গেছে একদিকে চলে অভিযান অন্যদিকে চলে বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন। ফলে এলাকার সচেতন মহল ওই অভিযানকে আইওয়াশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হাতিপাগাড় গ্রামের ছহর উদ্দিন, কালাকুমা গ্রামের রুহুল আমিনসহ আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একটি শ্যালোইঞ্জিন চালিত মেশিনে দিনে ৩/৪ ট্রাক বালু উত্তোলন করা যায়। প্রতিট্রাক বালু বিক্রি করা হয় ১১/ ১২ হাজার টাকায়। ট্রাকট্রলি ও মাহিন্দ্র যোগে এসব বালু দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক বালু যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। উভয় নদীর পারে শতাধিক বালুর ডিপো গড়ে তোলা হয়েছে। এতে বালু মহাল এলাকার আবহাওয়া দূষিত হওয়ার পাশাপাশি প্রানবৈচিত্র হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি। সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে।  অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত বালু বুঝাই শতশত ট্রাক বালু অবাধে চলাচলেন কারনে বালু মহালের দুপাশে রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গেচুরে চলাচল অনুপযোগি হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির সম্মুখিন হয়ে পরেছে।

অন্যদিকে ভোগাই সেতুর নিচের দুটি পিলারের কাছ থেকে দুই ফুট করে মাটি সরে গেছে। সেতুর পূর্ব পাশে রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের কালাকুমা  ও পশ্চিমে নয়াবিল ইউনিয়নের হাতিপাগাড় এলাকায় এসব শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।  বালু শ্রমিকরা  দিনেরাতে লাখ লাখ টাকা মূল্যের বালু উত্তোলন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে আসছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন  ২০১০ এ  সেতু, কালভার্ট, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারী স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকার  এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু  উত্তোলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ইজারাদারের লোকজন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে নয়াবিলের সঙ্গে রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সীমান্ত সড়কের সংযোগ স্থাপনের লক্ষে ভোগাই নদীর উপর ১৫০ মিটার দীর্ঘ  নাকুগাঁও সেতু নির্মাণ করা হয়। 

বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলনের সেতুটি হুমকির সম্মুখিন। একযুগের ব্যবধানে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এমর্মে সেতুর পাশে সাইনবোর্ড ও ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি নির্বাচনী  এলাকায় এলে তিনি ওই সেতুর উপর দিয়ে যান না। নয়াবিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো,নুর ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন,বালু মহালের ইজারাদারের লোকজন প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। আবার প্রতিবাদ করলেও কোন কাজে আসে না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে মাঝে মধ্যে বালু উত্তোলন যন্ত্র ধ্বংস করা হয়। করা হয় জরিমানা। কিন্তু অভিযানের পর আবারো পুরোদমে শুরু হয় নদীর পার কেটে বালু উত্তোলন।

ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের  সাধারণ সম্পাদক মো.আমজাদ হোসেন বলেন, অবাধে বালু উত্তোলন করায় বালু মহাল এলাকার মানুষ শব্দ দুষনে অতিষ্ঠ হয়ে পরেছে। বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলনের ফলে  নাকুগাঁও সেতুটি হুমকির মুখে পড়েছে। যা আমাদের এলাকার জন্য হুমকি স্বরূপ। পোঁড়াগাঁও ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা উকিল উদ্দিন বলেন, নদীতে বালু নেই। বালুদস্যুরা নদীর পার কেটে বালু উত্তোলন করে পুরোনদী ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষ। এব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এলাকার সচেতন মহল।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads