ভয়াল কালরাত আজ

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

পালিত হবে প্রতীকী ‘ব্ল্যাক আউট’

ভয়াল কালরাত আজ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৫ মার্চ, ২০২২

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, আগামী ২৭ মার্চ সমগ্র দেশব্যাপী সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের প্রতিবাদে হরতাল পালন করা হবে। শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে যখন এই হরতালের ঘোষণা করা হচ্ছিল ঠিক তখনই সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় বিমানে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করে। আর রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ট্যাঙ্ক এবং সৈন্যভর্তি ট্রাক ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ । জিরো আওয়ার বা আঘাত হানার সময় ছিল রাত ১টা।

কিন্তু হানাদার বাহিনী ফার্মগেটের সামনে এলেই পিকেটারদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পিকেটারদের হটানোর জন্য জিরো আওয়ারের অপেক্ষা না করেই গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শুরু হয় নিরস্ত্র বাঙালি নিধনের হত্যাযজ্ঞ। অপারেশন শুরুর দেড় ঘণ্টার মধ্যেই কর্নেল জেড এ খান ও মেজর বিল্লাল স্বাধীনতার স্থপতি, অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাসা থেকে তুলে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসে এবং ৩ দিন পর তাকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

রাত ১টা বাজার সাথে সাথে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২২তম বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা পিলখানা ইপিআর হেড কোয়ার্টারে আক্রমণ চালায়। পিলখানার সাথে সাথে রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাঁখারী বাজারসহ সমগ্র ঢাকাতেই শুরু হয় প্রচণ্ড আক্রমণ। রাজারবাগে পুলিশের বাঙালি সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তাদের সামান্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়েই। তবে ট্যাংক আর ভারী মেশিনগানের মুখে এ প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পুরো সদরদপ্তর। বিভিন্ন এলাকাতে যথেচ্ছ হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ করে চলে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী। পাকিস্তানি বর্বর সেনারা বাংলাদেশকে সশস্ত্র উপায়ে স্বাধীন করার উদ্যোক্তা কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং জগন্নাথ হলে হত্যা করা হয় কয়েকশ নিরীহ ছাত্রকে এবং বড় বড় গর্ত করে পুঁতে ফেলা হয় ওইসব লাশ। ওই কালরাতেই হত্যা করা হয় ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক অধ্যাপক ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, ড. ফজলুর রহমান খান, অধ্যাপক এম মনিরুজ্জামান, অধ্যাপক এম এ মুক্তাদির, অধ্যাপক এম আর খাদেম, ড. মোহাম্মদ সাদেক  প্রমুখ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে।

রোকেয়া হলের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো ক্যান্টনমেন্টে। সারা শহরে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে পাষণ্ডবাহিনী। রিকশাওয়ালা, ভিখারি, শিশু, ফুটপাতবাসী কেউই তাদের ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পায়নি। বস্তির পর বস্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং প্রাণভয়ে পলায়নপর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে ব্রাশফায়ারে পাখির মতো হত্যা করা হয়। ভস্মীভূত করা হলো দৈনিক ইত্তেফাক,  দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক গণবাংলা এবং দৈনিক পিপলের দপ্তর। মিরপুর, মোহাম্মদপুরের বিহারিরা নিজেদের বাঙালি প্রতিবেশীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো হিংস্র উল্লাসে। রাতারাতি ঢাকা পরিণত হলো মৃত মানুষের শহরে। ২৬ মার্চের সূর্য উঠলে দেখা গেল ঢাকা শহরজুড়ে নিরীহ মানুষের লাশ ও ভস্মীভূত ঘরবাড়ি। এভাবেই সেদিন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ধূলিস্মাৎ করেতে শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের গণহত্যা।

ভয়াল সেই রাতের কথা আজো ভুলেনি বাঙালিরা। এজন্য আজ রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত সারা দেশে প্রতীকী ‘ব্ল্যাক আউট’ পালন করা হবে। তবে কেপিআই এবং জরুরি স্থাপনা এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে। গতকাল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সরকারি তথ্য বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে আরো জানানো হয়, এ রাতে কোনো ধরনের আলোকসজ্জা করা যাবে না। তবে আগামীকাল ২৬ মার্চ শনিবার সন্ধ্যা থেকে আলোকসজ্জা করা যাবে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বসাধারণকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলেও তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়।

এ দিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সকাল ১০টায় গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সারা দেশে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গীতিনাট্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এছাড়া স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ২৫ মার্চ গণহত্যার স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকাসহ সকল সিটি করপোরেশনের মিনিপোলগুলোতে গণহত্যার ওপর দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা  হবে বলেও এতে জানানো হয়।

তথ্যবিবরণীতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে এ দিন বাদ জুমা দেশের সকল মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য উপাসনালয়গুলোতে সুবিধাজনক সময়ে প্রার্থনা করা হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে অনুরূপ কর্মসূচি পালন করা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads