ঢাকা নগরীর অনেক বিষয় যেমন দৃষ্টিকটু রয়েই গেছে তেমনি রয়েছে সাধারণ পথচারীদের ভোগান্তিও। হাতেগোনা কয়েকটি এলাকা ছাড়া অধিকাংশ সড়ক-ফুটপাথে মলমূত্রের ছড়াছড়ি। খোলা রাস্তাকে পাবলিক টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করছে অনেক উপায়হীন মানুষ। সংসদ ভবন, উচ্চ আদালত, রেলস্টেশন, উদ্যান, পার্ক, টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের কারণে। যাতে নগরীর সার্বিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং সংক্রমিত হচ্ছে রোগবালাই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে-সেখানে মল ত্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণ হয়। পানি ও ধূলোর সঙ্গে মলমূত্র মিশে মানবদেহে নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে। রাজধানী ঢাকায় পাঁচটি রোগের অন্যতম কারণ হচ্ছে মানব বর্জ্য। এ কারণে সারা বছরেই এসব রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকে।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের বক্তব্য হলো, দেড় কোটির বেশি মানুষের এই শহরে প্রয়োজনীয়সংখ্যক টয়লেট নেই, যা একজন নাগরিকের পথচলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা। অথচ উন্নত শহরগুলোতে রাস্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্থায়ী এমনকি মোবাইল টয়লেটও রাখা হয়। ভাসমান মানুষের জন্য বিনামূল্যে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে। রাজধানী ঢাকায় এরকম সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মানব বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও সাধারণ মানুষ টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ পান না। তাই অপারগ হয়ে যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট। অথচ রাষ্ট্রীয় এই স্থাপনার চারপাশের দেয়ালজুড়ে নোংরা পরিবেশ। দুগর্েন্ধ পাশ দিয়ে হাঁটা যায় না। ভাসমান মানুষের বসবাস ফুটপাথ আর দেয়াল ঘেঁষে ও মাজারের মাঠজুড়ে। ফুটপাথে মলমূত্র থাকলেও পরিষ্কারের কোনো বালাই নেই। প্রেস ক্লাবের সামনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতে ভাসমান মানুষ যারা ফুটপাথে থাকে তারাই এখানে মলমূত্র ত্যাগ করে। আমাদের চোখের সামনে হলে বারণ করি। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভাসমান মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অথবা আশপাশে ভাসমান মানুষের জন্য বিনামূল্যে মোবাইল টয়লেটের ব্যবস্থা করারও পরামর্শ দেন পুলিশ সদস্যরা।
একই চিত্র কার্জন হলের সামনের ফুটপাথ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, বুয়েটের কিছু রাস্তা, ঢাকেশ্বরী এলাকায়ও এমন দৃশ্য লক্ষ করা গেছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের চারপাশেও মলমূত্র রয়েছে।
বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মতিঝিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে ও সামনের কিছু অংশে, সেনা কল্যাণ ভবনের দেয়ালের একপাশেও প্রকাশ্যে ভাসমান মানুষদের মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা গেছে। ফকিরাপুল পানির ট্যাংকি এলাকাতেও এ চিত্র। জাতীয় প্রেস ক্লাবের দেয়াল, শিক্ষা ভবন, সিরডাপ মিলনায়তনের দেয়াল আড়াল করে রাতদিন পথচারীদের প্রস্রাব করতে দেখা যায়।
চিত্র দেখলে মনে হবে এই স্থাপনার দেয়ালগুলো হয়তো এ কারণেই নির্মাণ হয়েছে! অথচ সিরডাপ মিলনায়তনের দেয়াল ঘেঁষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি মোবাইল টয়লেট রয়েছে। যেটি সব সময় বন্ধ থাকে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সেখানে সন্ধান করে পাওয়া যায়নি।
টিটিপাড়া মোড় থেকে একদিকে শাজাহানপুর-খিলগাঁও চৌরাস্তাসহ সব মিলিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের সীমানা। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরের চিত্র প্রায় সমান। এই এলাকায় কয়েক কিলোমিটারের বাতাস স্বাভাবিক নয়। মলমূত্রের গন্ধে বাতাস সব সময় ভারি থাকে। স্টেশনের ভেতরে আছে ভাসমান দুই শতাধিকের বেশি মানুষের উপদ্রব। এরা রাত দিন স্টেশনেই থাকে। এদের মধ্যে একটি অংশ থাকে প্ল্যাটফর্মের ছাদে। অপর অংশটি থাকে নিচে শহরতলি প্লাটফর্ম ও আন্তঃজেলা প্লাটফর্মে।
রাত ১০টার পর স্টেশনে গেলে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের কারণে হাঁটার জায়গা পাওয়া যাবে না। তবে স্টেশনে দুটি শৌচাগার থাকলেও ভাসমান মানুষ তা কমই ব্যবহার করে। এসব মানুষ খোলা জায়গাতে সারে প্রাকৃতিক কাজ। স্টেশনের ভেতর দিয়ে ফুট ওভারব্রিজে ওঠার রাস্তাটি দিয়ে মূত্রের গন্ধে একেবারেই চলা দায়। বাইরে হাতের বাম পাশ দিয়ে টিটিপাড়া দিকে যেতে সড়কটির ফুটপাথ ব্যবহারের উপযোগী নয় একেবারেই। দেয়াল ঘেঁষে দিন-রাত হাজারো মানুষকে প্রস্রাব করতে দেখা যায় এখানে। দুর্গন্ধযুক্ত পানি গড়িয়ে রাস্তায় আসছে। কমলাপুর থেকে মাজার রোডে যেতে ডানদিকের সড়কের চিত্র একই। টিটিপাড়া থেকে খিলগাঁও রেলগেট পর্যন্ত বিশ্বরোডের বাম পাশের ফুটপাথ দিয়ে মলমূত্রের কারণে চলা দায়। খিলগাঁও রেলগেট থেকে উড়াল সড়কের নিচের দৃশ্যপট একই। এসব পথে হাঁটতে হলে নাকে রুমাল চেপে রাস্তা পার হতে হয় পথচারীদের। এর বাইরে সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী গোলাপবাগ এলাকাতেও রাস্তার ওপর মলমূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়।
মহাখালী বাস টার্মিনালের ভেতরে একটি পাবলিক টয়লেট থাকলেও তা বোঝার কোনো উপায় নেই আশপাশের রাস্তা ও টার্মিনালের ভেতরের পরিবেশ দেখে। টার্মিনালের বাইরে দেয়ালজুড়ে মলমূত্রে বাজে অবস্থার তৈরি হয়েছে। মানববর্জ্য গড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত আসছে। তাই অনেকে এখন আর ফুটপাথ ব্যবহার করেন না। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার অনেক সড়কে এমন চিত্র দেখা গেছে। ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার এলাকাতেও ভাসমান মানুষ আর অসচেতন পথচারীদের কারণে হচ্ছে পারবেশ দূষণ। ফার্মগেট এলাকার পার্কসহ আশপাশের রাস্তাজুড়ে রাত দিন চলছে মলমূত্র ত্যাগ। খোদ সংসদ ভবনের খেজুরবাগান এলাকা যেন মল আর মূত্রের কেন্দ্রস্থল। গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি প্রতিদিনই দেখতে আসে হাজারো পর্যটক। তা ছাড়া বিকেলবেলা সংসদ ভবন এলাকাজুড়ে ভিড় করেন বিনোদনপিপাসু মানুষ। তাদের একটি অংশ ইচ্ছেমতো প্রস্রাব করেন।
রমনা পাকের্র চারপাশের দেয়ালজুড়ে পথচারী ও ভাসমান মানুষের মলমূত্র ত্যাগের দৃশ্য চোখে পরবে যে কোন সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে মানবর্জ্যের দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশের খারাপ অবস্থা।
আমিনবাজার থেকে টেকনিক্যাল সড়ক পর্যন্ত ফুটপাথজুড়ে প্রায় সব সময় মানুষের লাইন। তাদের কাজ একটাই যখনই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয় তখনি দেয়াল আড়াল করে প্রস্রাব করতে দেখা যায়। এ কাজটি বেশিরভাগ করে থাকেন মোটরযান শ্রমিকরাই। টেকনিক্যাল মোড়ের বিপরীতের সড়কটির ফুটপাথের অবস্থা একই রকমের।
অন্যদিকে চন্দ্রিমা উদ্যান, বলধা গার্ডেন, শাহবাগ, ফুলার রোড, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সীমানা প্রাচীর, টিএসসি থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কের পূর্ব পাশ, এফ রহমান হলের পূর্ব পাশের দেয়াল, যাত্রাবাড়ী, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচ, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকাসহ অনেক এলাকায় রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলানো ও ফুটপাথে মূত্র ত্যাগ নিত্যদিনের চিত্র।
দুই সিটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৮টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৭টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে নিয়োজিতরা বলছেন, নতুন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেক উদ্বোধনও করা হচ্ছে। পাবলিট টয়লেটের সংখ্যা বাড়লে ফুটপাথে মলমূত্র ত্যাগের চিত্র কমে আসবে।
উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, আপনারা নাগরিকরাই মেয়রের ভূমিকা পালন করবেন। যেখানে ময়লা, আবর্জনা, ম্যানহোলের ঢাকনা নেই সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলে নগর এ্যাপে দেবেন। তখন সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বরত কর্মকর্তা তা সমাধানের পদক্ষেপ নেবে। সেই সমস্যা যদি সংশ্লিষ্টরা সমাধান না করেন সঙ্গে সঙ্গে মেয়রের কাছে এই বিষয় নোটিফিকেশন-ঘণ্টা বেজে উঠবে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়র সেসব কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসবেন।
বিশিষ্ট চিকিৎসক ও হেলথ অ্যান্ড হোপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, মলমূত্রের মতো মানব বর্জ্য হলো রোগ জীবাণুর আধার। খোলা বর্জ্য শুকিয়ে ধুলো অথবা খাবারের সঙ্গে কিংবা পানিতে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে। এতে টায়ফয়েড, জন্ডিস, আমাশয়, ডায়রিয়া ও কৃমি রোগ হতে পারে। রাজধানীতে এসব রোগের প্রধান কারণ খোলা মানব বর্জ্য। তিনি বলেন, খোলা মানব বর্জ্যের কারণে এসব রোগ ঢাকার মানুষের দেহে সারা বছর লেগে থাকে।
সমীক্ষায় দেখা যায়, সিটি করপোরেশন নির্মিত মোট পাবলিক টয়লেটের মধ্যে এখন ৪৭টি নামমাত্র টিকে আছে। বাকিগুলোর মধ্যে দুটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, ১০টি বন্ধ হয়ে গেছে এবং ১০টিতে কোনো সেবা নেই। ২০১১ সালে সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ ও ওয়াটার এইড পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটারের এই শহরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের মধ্যে পাঁচ লাখ ভাসমান, রিকশাচালক ১০ লাখ, অন্যান্য জীবিকার মানুষ ১০ লাখ, নিয়মিত পথচারী ২০ লাখ এবং ঢাকার বাইরে থেকে আসা ১০ লাখসহ মোট ৫৫ লাখ মানুষের প্রতিদিন চলাচলের সময় টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে।
ঢাকার বাসিন্দাদের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও পাবলিক টয়লেটগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশেই নারীদের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। নেই শিশু ও প্রতিবন্ধীদের ব্যবহার উপযোগী টয়লেট।
শহরের অলিগলি, প্রধান সড়কের আশপাশ প্রায় সবখানেই এ চিত্র নিয়মিত। তবে সম্প্রতি যেসব আধুনিক টয়লেট নির্মাণ হয়েছে এর সবকটিতেই নারী-পুরুষের জন্য পৃথক ব্যবস্থা আছে।
১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকায় সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত হয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় বায়ুর সঙ্গে মিশ্রিত বিভিন্ন দূষিত পদার্থ ফুসফুসে গিয়ে নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করে থাকে। পরিবেশ অধিদফতরের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকায় বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। বায়ু দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ঢাকায় বছরে ১৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকে।
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ঘনমিটার জায়গায় এসপিএম মিশে ২০০ মাইক্রোগ্রাম। এটা জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে দ্বিগুণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানের চেয়ে ১০ গুণ বেশি।
এ ছাড়া ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকর নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মিশে যাচ্ছে অনিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশনের কারণেও। বায়ুসহ অন্যান্য পরিবেশ দূষণের কারণে রাজধানীসহ বাংলাদেশের মানুষ নানা ধরনের রোগে ভুগছে। এর মধ্যে কার্ডিওভাস্কুলার (হূদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি) রোগ, অ্যাজমা (হাঁপানি), বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং আইকিউ হ্রাস পাওয়ার মতো নানা ধরনের অসুস্থতায় ভুগছে। মলমূত্র ও সার থেকে বায়ুবাহী ক্ষতিকর কণা তৈরি হচ্ছে এবং তা ফুসফুসে গিয়ে ক্ষতি করছে।
রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। সেইসঙ্গে যারা দূষণ সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পরিবেশ অধিদফতরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।





