মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে দেশজুড়ে চলমান আন্দোলন সংগ্রামে অন্যান্য স্থানের মতো মাগুরার ছাত্রসমাজেরও ভূমিকা ছিল ব্যাপক। ভাষার পক্ষে আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নেওয়ায় তৎকালীন সময়ে স্কুল বয়সেই তাদেরকে জেল-জুলুম, নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ফেব্রুয়ারি এলেই প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে সেই মহান সংগ্রামের অগ্নিঝরা দিনগুলো।
সে-সময়ে মাগুরা ছিল বৃহত্তর যশোর জেলার অধীন একটি ছোট মহকুমা শহর। এখানে তখন কলেজ পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাত্র একটি থাকায় স্থানীয় মানুষ যশোরকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মাগুরার কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের থেকে স্কুল পড়ুয়া ছাত্রদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। মাগুরা শহরের নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়া, জলিল খান, আমিনুল ইসলাম চান্দু, খান জিয়াউল হক, আজিম দেওয়ান প্রমুখের নেতৃত্বে মাগুরা ইসলামিক কলেজের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন।
এসব ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহরের চৌরঙ্গী মোড়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জে বেশকিছু ছাত্র গুরুতর আহত হয়। পরে শহরের নোমানি ময়দানে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাগুরা মডেল হাইস্কুল, নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শ্রীপুর হাইস্কুল প্রভৃতি স্কুলের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর পুলিশের বেপরোয়া গুলিবর্ষণের অব্যবহিত পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অঞ্চলভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশে নিয়ে কাজ করতে থাকে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল থেকে মির্জা শওকত হোসেনের নেতৃত্বে একদল ছাত্র মাগুরায় এসে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে ভাষা আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে সভা-সমাবেশ করে।
এরপর থেকে মাগুরার শ্রীপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জোয়ারদার আবদুর রহিমের সহযোগিতায় নাকোল রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র একেএম হামিদুজ্জামান এহিয়া বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রদের সংগঠিত করার কাজে লেগে যান। লিফলেট তৈরি করে সহপাঠীদের নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যান। প্রয়াত এই ভাষাসৈনিকের নেতৃত্বে আবদুস সালাম দুলাল, আলী আহমদ, জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ, আবদুর রাশেদ, জয়নউদ্দিন বিশ্বাস, মোসলেম মোল্যা, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫৪ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে নাসিরুল ইসলাম আবু মিয়া, জলিল খান এবং আরো অনেকে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে মাগুরার বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথকভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মাগুরা ইসলামিক কলেজের ছাত্ররা ও মাগুরা মডেল হাইস্কুলের ছাত্ররা এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে বিস্তারিত কর্মসূচিতে অংশ নেয়। অপরদিকে নাকোল, শ্রীপুর স্কুলের ছাত্ররা বাঁশ দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করে পুষ্পস্তবক অর্পণ, শোক র্যালি ও আলোচনা সভার মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি পালন করে। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে হামিদুজ্জামান এহিয়াকে ১৯৫৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি বেলুচ আর্মড ফোর্স গ্রেপ্তার করে। তার ওপর অমানুষিক পুলিশি নির্যাতন চালানো হয়। হামিদুজ্জামান এহিয়ার মুক্তির দাবিতে মাগুরার ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তার কৌঁসুলি হিসেবে প্রয়াত মন্ত্রী অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন ও প্রয়াত এমএন সৈয়দ আতর আলী কাজ করেন।
জেল থেকে বেরিয়ে তিনি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং অন্যদের সচেতন করতে মাগুরার বিভিন্ন অঞ্চল ছুটে বেড়ান। ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে যশোর সার্কিট হাউসে জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে হামিদুজ্জামান এহিয়ার সাক্ষাৎ হয়। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হামিদুজ্জামানের সাহসী ভূমিকার জন্য প্রশংসা করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও নেই যে, ভাষার জন্য কোনো জাতি তার প্রাণ দিয়েছে। সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বায়ান্নর আন্দোলনে মাগুরার ছাত্র-জনতার ভূমিকা অনস্বীকার্য।





