রাজনীতি

মাঠে নামছে বিরোধী দলগুলো

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১২ মার্চ, ২০২২

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বোগতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমান্বয়ে জনরোষ বাড়ছে। বিগত দুই বছর দেশের বাজারে সব পণ্যের দামেই অস্বস্তি। আর এ অস্বস্তি এখন বাজার ও ঘর ছেড়ে রাজপথে। দ্রব্যমূল্যেই ঊর্ধ্বগতি এখন প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সব রাজনৈতিক দলগুলো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করায় সরব হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ।

এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে মাঠে মেনেছে কয়েকটি বামদলসহ দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। তবে এ কারণে স্বাস্তিতে নেই ক্ষমাতাসীন আওয়ামী লীগেও। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, এ সরকার মানুষের কষ্ট বুঝে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়াতে গরিব মানুষ হাহাকার করছে। অথচ সরকারের লুটপাট আর দুর্নীতির কারণেই দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বেগতি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে না আনা হলে রাজপথ ছাড়বে না রাজনৈতিক দলগুলো।

অন্যদিকে বর্তমান সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার বলছেন, বিশ্ববাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশের বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী খাদ্য মজুত করে বাজার অস্থিতিশীল করে সরকারকে বিব্রত করতে চায়। তারা বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী রাজনীতিকেও উস্কে দিচ্ছে। আর বিএনপি এটাকে ইস্যু বানিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। ষড়যন্ত্রে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকার। দ্রব্যমূল্যের লাগম টেনে ধরাই যেন মুশকিল হয়ে গিয়েছে। দেশের বাজার পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। পেঁয়াজের ঝাঁঝে ক্রেতাদের চোখে পানি আসছে আর সয়াবিন তেলের বাজার চড়া হতে হতে এখন ধরাছোয়ার বাইরে। সব পণ্যের দামেই অস্বস্তি। আর বাজার পরিস্থির এই অস্বস্তি এখন বাজার বা ঘর ছেড়ে রাজপথে। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে রাজপথের আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সারা দেশেই সভা-সমাবেশ করছে। বাম দলগুলোও বসে নেই। তারাও এ নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আওয়ামী লীগও অস্বস্তিতে রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।

গত প্রায় দুই বছর ধরে মহামারি করোনোর বিপর্যস্ত সারা বিশ্ব। চলমান গতিশীল অর্থনীতির ওপর বড্ড ধাক্কা নিয়ে আসে এই করোনা মহামারি। করোনার কারণে সব কিছুতেই এক ধরনের স্তবিরতা নেমে এসেছিল। ফলে তার প্রভাব পরে রাজনীতিও। রাজনৈতিক দলগুলো এ সময় তেমন কোনো কর্মসূচি করতে পারছিল না। যাও বা ছিল, তা কেবল ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সময় গড়িয়ে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ফলে রাজনীতির মাঠও সরগরম হতে শুরু করেছে। করোনার সংক্রমণের পর প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম হতে থাকে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন রাজনীতির নতুন ইস্যু। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য কিছুটা দায়ি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং কিছুটা দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনীতির মাঠের গরম। এখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে রাজপথে আন্দোলনে করছে বিরোধীদলগুলো। দ্রব্যমূল্য যেন তাদের রাজনীতির খোড়াক জুগিয়েছে। এই নিয়েই চলছে রাজনীতির মাঠে কাদা ছোড়াছুড়ি। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট আগামী ২৮ মার্চ সারা দেশে অর্ধ দিবস হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনের হলরুমে এক সংবাদ সম্মেলনে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জোটের সমন্বয়ক সাইফুল হক, সাবেক সমন্বয়ক বজলুর রশিদ ও সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সিপিবি, বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আটটি রাজনৈতিক দলের ঐক্য ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’।

বাম সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মানুষ নিদারুণ অর্থ ও খাদ্য সংকটে আছে। এমন বাস্তবতায় তারা হরতালের সিদ্ধান্ত নিতে তারা বাধ্য হয়েছেন। দলমত নির্বিশেষে সবাই এ কর্মসূচিতে অংশ নেবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা (সিপিবি) সারা দেশে এক সপ্তাহের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এটা গত বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) থেকে শুরু হয়েছে, আগামী ১৬ মার্চ পর্যন্ত চলবে। এরই মধ্যে বাম নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, অন্যান্য সমমনা দলের নেতাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা একটা কর্মসূচি ঠিক করছি, সেটা হলো- আগামী ২৮ মার্চ সারা দেশে অর্ধদিবস হরতালের ডাক দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। এদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচি পালিত হবে।

সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, চাল, তেল, পেঁয়াজসহ ভোগ্য ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে দেশের বাজারে।

দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির ফলে টিসিবির পণ্য বিক্রির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ হচ্ছে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের লাইন। নিম্নবিত্তের অবস্থাতো আরো করুন। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়াতে গরিব মানুষ হাহাকার করছে। কিন্তু এ সরকার বধির, গরিবের হাহাকার সরকারের কানে যায় না। মন্ত্রীরা নানা রকম কথা বলে মানুষের দুঃখ কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ সরকারের বিরুদ্ধে এখনি রুখে দাঁড়াতে হবে।

এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়ের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম সরকার দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকার পতনে বৃহৎ কর্মসূচি ঘোষণা করার হুঁশিয়ারি দেন। 

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, বাংলাদেশ কঠিন সময় অতিবাহিত করছে, যখন দেশে দ্রব্যমূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সংসার চালাতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে করোনাকালে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে তাদের সবার কর্মসংস্থান হয়নি। সব মিলিয়ে দেশে বেকারের সংখ্যা অন্তত ৫ কোটি। এমন বাস্তবতায় যেভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে তাতে মনে হয় দেশের মানুষের প্রতি সরকারের কোনো দরদ নেই। সরকার মানুষের কষ্ট বোঝে না, মানুষের মনের ভাষা বোঝে না।

তিনি বলেন, আমরা মানুষের সকল অধিকার সুরক্ষিত করতেই রাজনীতি করছি। আমরা মাঠে আছি, মাঠে থাকবো। গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে আমরা কখনো আপস করবো না। যদি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, যদি দেশের দুর্নীতি বন্ধ করা না হয়, যদি দেশের টাকা পাচার বন্ধ না হয়, টেন্ডারবাজি, দলবাজি আর চাঁদাবাজি বন্ধ না হয় তাহলে জাতীয় পার্টি আর রাজপথ ছাড়বে না।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল আলমগীর অভিযোগ করে বলেন, সরকারের লুটপাট আর দুর্নীতির কারণেই দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। এই সরকারের কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সিন্ডিকেটগুলো কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের যেমন বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই, একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নেই, উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ নেই। দুর্নীতির কারণে এমন একটা পর্যায় চলে গেছে যে জিনিসপত্রের দাম প্রতিটি ক্ষেত্রে ২০-২৮ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারের চরম দুর্নীতির প্রভাব প্রভাব বাজারে গিয়ে পড়ছে এবং জনগণকে তার মাশুল দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা তখনই সম্ভব হবে যখন একটা গণতান্ত্রিক সরকার হবে। মানুষের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে তখনই যখন একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসবে। তাই জনগণ আর বসে থাকবে না, গণআন্দোলনে ভেসে যাবে ‘অবৈধ’ শাসকগোষ্ঠী। আগামীতে জনগণের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার হবে। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী খাদ্য মজুত করে অস্থিতিশীল করতে চায় আর বিএনপি-জামায়াত এই শ্রেণি ব্যবসায়ীদের উস্কে দেয়। এরা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বহু ধরনের ষড়যন্ত্র হয়েছে। এখনো কিছু ব্যবসায়ী ষড়যন্ত্রে জড়িত। যারা এই মূল্য বৃদ্ধি করের সরকারকে একটি বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়। জনগণকে বিক্ষুব্ধ করতে চায়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বাজারে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি ষরযন্ত্রে জড়িতদের চিহ্নিত করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার।

দ্রব্যমূল নিয়ে কারো রাজনীতি করার সুযোগ নেই উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, নিত্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে শক্ত অবস্থান নিয়েছে সরকার। কেউ দাম বাড়ালে আমরা অ্যাকশনে যাচ্ছি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads