মাদক কারবারিরা মিয়ানমার থেকে ভয়ানক মাদক আইস আনতে ব্যবহার করছে সে দেশের মোবাইল সিম কার্ড। মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক এতোই শক্তিশালী যে, কক্সবাজারের কলাতলী থেকেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে মাদক কারবারিরা ওই সিম ব্যবহার করছে। এসব সিম কিনতে লাগছে না কোনো কাগজপত্র কিংবা ছবি। ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। এসব সিম দিয়ে চোরাকারবারিরা নিয়মিত মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও আইস নিয়ে আসছে।
জানা যায়, টেকনাফ পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় মোবাইল ফোন ফ্রিকোয়েন্সির বেশ কয়েকটি টাওয়ার স্পষ্ট দেখা যায়। উখিয়া সীমান্তে অবশ্য তেমন দেখা যায় না। তবে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে গাছগাছালি কম হওয়ায় নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সি বেশি পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমান্তের ওপারে যেন না থাকে সেজন্য দেশের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার তাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে না বরং সীমান্তবর্তী এলাকায় তারা মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার সংখ্যা বাড়িয়েছে। এসব টাওয়ার এমপিটি (মিয়ানমার পোস্টস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস) নামের একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানের বলে জানা যায়।
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, কক্সবাজারের টেকনাফে যারা মাদক কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের বেশিরভাগের মোবাইলেই মিয়ানমারের অপারেটরের সিম পাওয়া যায়। মিয়ানমারের কয়েকটি বেসরকারি মোবাইল কোম্পানির সিম একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশে আসছে। সিম কেনার পর রিচার্জও করে দেয় ওই সিন্ডিকেট।
জানা যায়, দেশীয় মোবাইল কোম্পানির সিম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা করলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে মাদক কারবারিরা মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করে। তবে যারা এই সিম ব্যবহার করে তাদের সংখ্যা সীমিত। তাদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। যে কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।
মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে চাইলে কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান বলেন, দেশের মাদক কারবারিরা মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমান্তের ওপারে যেন না থাকে সেজন্য আমরা যেভাবে নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল করছি ঠিক সেভাবে মিয়ানমার তাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক কন্ট্রোল করে না। সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমার তাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার সংখ্যা বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বাংলাদেশি মোবাইল নেটওয়ার্কে কাজ হবে না। সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের টাওয়ার সংখ্যা বাড়ার কারণে দেশের মাদক কারবারিরা মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করে ওই দেশের কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এমনকি কক্সবাজারের কলাতলীতে পর্যন্ত মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। সিমের রিচার্জও মিয়ানমারের মাদক কারবারিদের মাধ্যমে করা হয়।
দেশে আইস আসা সম্পর্কে র্যাব-১৫ এর উপ-অধিনায়ক বলেন, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা সহজলভ্য হলেও আইস এখনো সেভাবে সহজলভ্য হয়নি। আইস আনতে গেলে মিয়ানমারের আইসের মূল সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সেজন্য দেশের মাদক কারবারিরা মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করে ওই সিন্ডিকেটের সাহায্যে দেশে আইস নিয়ে আসছে।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে যেভাবে ইয়াবার বিস্তৃতি বেড়েছে ঠিক সেভাবে আইসের বিস্তার বাড়াতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি মাদক সিন্ডিকেট কাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আনার পর এই সিন্ডিকেট আইসও আনা শুরু করে। ইয়াবার চেয়ে আইসের দাম ও লাভ বেশি হওয়ায় কারবারিরা সহজেই আইসের দিকে ঝুঁকছে। ফলে মাদকসেবীরাও নতুন এ মাদকের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সীমান্তে একাধিক তল্লাশি চৌকি থাকার পরও মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে ঢাকায় আইসের চালান আসছে নিয়মিত। সম্প্রতি ডিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও র্যাব যে আইসের চালান জব্দ করে, সেগুলো টেকনাফ হয়ে ঢাকায় আসে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইয়াবার পাশাপাশি বাংলাদেশে আইসের বাজার বড় করতে মিয়ানমারের কারবারিরা এ মাদক কম মূল্যে বিক্রি করছে। এক গ্রাম আইসের দাম মিয়ানমারের কারবারিরা রাখছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা, যা বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। দুই দেশের মাদক কারবারিদের বোঝাপড়া এতোটাই হয়েছে যে, কোনোভাবে আইসের কোনো চালান যদি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জব্দ হয়, তবে সেজন্য কোনো ধরনের পেমেন্ট নেয় না মিয়ানমারের মাদক কারবারিরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপ-পরিচালক (উত্তর) রাশেদুজ্জামান বলেন, টেকনাফ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে কুরিয়ারে আইস ও ইয়াবার চালান ঢাকায় আসছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আইস আসছে সেসব কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। সম্প্রতি ঢাকা ও কক্সবাজারসহ সারা দেশেই আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার জানান, আইস বিত্তবান ও তাদের বখাটে সন্তানরা নিয়ে থাকে। মূলত সিসা লাউঞ্জে সিসা সেবনকারীরা এসব মাদক নিয়ে থাকে। আইস অত্যন্ত মারাত্মক উত্তেজনাকর ও ব্যয়বহুল মাদক। এটি গ্রহণে হরমোনের উত্তেজনা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বহুগুণ বাড়ে। ফলে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।





