দেশে অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে মানসিক রোগীর সংখ্যা। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহননকারীর সংখ্যাও। সম্প্রতি সময়ে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। যেসব ঘটনার ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, মানসিকভাবে অনেক শক্ত মানুষও হঠাৎ করে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। মানসিক অবসাদে ভুগে প্রতি বছর নীরবে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও এ বিষয়ে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা কিংবা কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরিভিত্তিতে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করাসহ দেশের হাসপাতালগুলোতে মনোরোগ বিষেশজ্ঞের সংখ্যা বৃদ্ধি করা উচিত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ১৬ দশমিক ১ ভাগ মানসিক রোগে ভুগছেন। এছাড়া উদ্বেগাধিক্যতে (অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার) ৮ দশমিক ৪, বিষণ্নতায় (ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার) ৪ দশমিক ৬, গুরুতর মানসিক রোগে (সাইকোসিস) ১ দশমিক ১ এবং মাদকাসক্তিতে (ড্রাগ এডিকশন) শূন্য দশমিক ৬ ভাগ লোক ভুগছেন।
এদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রন্তের হার আরো বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ ভাগই মানসিক রোগে আক্রান্ত। এছাড়া এ বয়সী শিশুদের ৩ দশমিক ৮ ভাগ মানসিক প্রতিবন্ধী, ২ ভাগ মৃগিরোগে আক্রান্ত এবং শূন্য দশমিক ৮ ভাগ মাদকাসক্ত।
মানসিক রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে আত্মহননকারীর সংখ্যাও। শুধু বয়স্ক নারী-পুরুষ নয়, অল্পবয়সী এমনকি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ অতিমাত্রায় হতাশাগ্রস্ত ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ায় আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। সব বয়সী মানুষের মধ্যেই বেড়েছে এর প্রবণতা।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) সূত্র বলছেন, মার্চ ২০২০ থেকে নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন ১ হাজার ৫৮ জন মানুষ। অন্যদিকে ২০১৯ সালের জুন থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২০ এই নয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৯৪০।
পুলিশ সদরদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৩৯ জন আত্মহত্যা করেছেন। এসব আত্মহত্যা হয়েছে ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষপানে। এর বাইরে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, লাফিয়ে পড়া, রেললাইনে ঝাঁপ দেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল।
২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করে। এর বেশিরভাগ ২১ থেকে ৩০ বছরের নারী।
আত্মহত্যা নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক কলহ, মাদক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা, পারিবারিক বন্ধন ফিকে হয়ে আসার মতো কারণগুলো প্রকট আকার ধারণ করায় মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া নৈতিক স্খলন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, ব্ল্যাকমেইলিং অনেককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মোহিত কামাল বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মানুষ বুদ্ধি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এতে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। বিষণ্নতার চরম পরিণতি হচ্ছে আত্মহত্যা। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে আত্মহত্যার প্রবণতাও কমে আসবে। সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, পরকীয়া সমস্যা, যৌতুক এসব কারণে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে পরিকল্পনা করেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী সমপ্রতি রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে চলমান মহামারির মধ্যে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে একই সময়ে তার দ্বিগুণ বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, সামপ্রতিক সময়গুলোতে যৌথ পারিবারিক কাঠামো ভেঙে একক পরিবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে মানুষ ছোটবেলা থেকেই একটু বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ছে। অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়াও আত্মহত্যার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে শিশুরা বেশি সময় ব্যয় করছে। এ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে তাদের চোখ, মাথা ও কানের মতো পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ওপর অতিমাত্রায় চাপ পড়ছে। এতে তারা সংবেদনশীল হতে বাধ্য।
তিনি বলেন, মূলত প্রত্যাশিত চাহিদা পূরণ করতে না পারা মানুষকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়। একজন মানুষের জীবনে একের পর এক এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি তাকে চরম মাত্রায় হতাশ করে তোলে। একপর্যায়ে সে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এটাই হয়ে আসছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার ঘটনা নির্মূলে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ ও প্রয়াস থাকলেও এ প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। তবে প্রচেষ্টাগুলো আরো বেশি মনোযোগ পাওয়ার দাবি রাখে। পাশাপাশি অবকাশ রাখে নতুন ভাবনা ভাবার। শিল্পায়নের সঙ্গে নগরায়ণ, একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় পাল্লা দিয়ে সমাজ নানা জটিল বাঁক নিচ্ছে। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো দিন দিন হালকা হয়ে যাচ্ছে। সঠিক সামাজিকীকরণ, শক্তিশালী ও কার্যকর সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধসমূহ ধারণ ও লালন, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংহতি স্থাপন করা সম্ভব হলে তা হবে আত্মহত্যা নিরসনের মূল হাতিয়ার। তারা বলেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে আরো বেশি শক্তিশালী করা প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। মেয়েদের জন্য তৈরি করতে হবে সামাজিক সুরক্ষার বলয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মেয়েরা শুধু মেয়ে হওয়ার কারণেই নানা সংকটের সম্মুখীন হয়, যা তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার আবহ তৈরি করে। সেই সঙ্গে নারীবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও এর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সালাউদ্দীন কাওসার বলেন, কেউ কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হলে তার সঠিক চিকিৎসা না হলে বিষণ্নতা ও হতাশায় নিমজ্জিত হয়। ভুগতে থাকে মানসিক রোগে। আর এর শেষ পরিণতি গিয়ে ঠেকে আত্মহত্যায়।
এদিকে মানসিকরোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় রয়েছে যথেষ্ট চিকিৎসক সংকট। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন শূন্য দশমিক ৫০ জন। এর মধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) ২২০ জন। অর্থাৎ প্রতি লাখ মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ১৩ জন। একইভাবে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ৫০ জন- অর্থাৎ প্রতি লাখ মানুষের জন্য শূন্য দশমিক শূন্য তিনজন। সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কার রয়েছেন মাত্র ৭, অকুপেশনাল থ্যারাপিস্ট মাত্র ৩ জন।
এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহিত কামাল বলেন, মানসিক রোগী আগের তুলনায় বেড়েছে। শুধু ২০১৬ সালেই বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এক সময় মাদক সেবন মানসিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হতো না। এখন এটি জটিল মানসিক রোগ। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বড় ৮টি মেডিকেল কলেজে মানসিক রোগ বিভাগে কোনো অধ্যাপকের পদ নেই। বছরে ১২ থেকে ১৫ জন করে মানসিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ তৈরি হলেও তাদের পদায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি শূন্য পদের বিপরীতেও নিয়োগ হচ্ছে না।





