আজ ১৩ই ডিসেম্বর। ৭১’র এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা পাক-হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মির্জাপুরকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ায়। টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর কবলে চলে যাওয়ার পর ৩ এপ্রিল ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলে প্রবেশের চেষ্টা চালায় পাক হানাদার বাহিনী। কিন্তু দেশে সর্বপ্রথম মির্জাপুর উপজেলার গোড়ান-সাটিয়াচড়া এলাকায় ইপিআর, পুলিশ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা ও গাজীপুর জেলার বাইরে মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের সাটিয়াচড়া-গোড়ান গ্রামে প্রতিরোধ যুদ্ধে সাটিয়াচড়া গ্রামের ১৯ ও গোড়ান গ্রামের ২৭ জন, বীর ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর ২৯ জন, পাকুল্যা গ্রামের ৩ ও অন্যান্য জেলা-উপজেলার অজ্ঞাত ৫১ জন বীর শহীদ হন এবং ওই যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ২৩ জন নিহত হয়। স্থানীয় রাজাকার ওয়াদুদ মাওলানার নেতৃত্বে দুই গ্রামে ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে শতাধিক গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকবাহিনী।
গোড়ার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মুনসুর আহমেদ বাংলাদেশের খবরকে এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিলো মির্জাপুর। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল প্রবেশের চেষ্টার সংবাদের ৭১’র ২ এপ্রিল রাজেন্দ্রপুর থেকে (জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট) ৩০-৩৫ জন ইপিআর আসে আমাদের গোড়ান গ্রামে। আমরা সেখানে যৌথভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই এবং তাদের থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করে দেই এবং ওই রাতেই পাক বাহিনীরা আমাদের গ্রামে আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি নেয়। পরদিন ৩রা এপ্রিল ভোর ৫টা থেকে বেলা ৪টা পর্যন্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে পাকসেনারা গোড়ান-সাটিয়াচড়া দুটি গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে প্রায় একশত দশজন মানুষকে হত্যা করে। এসময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও ইপিআর সদস্যদের সহযোগিতায় পাক বাহিনীর দুটি গাড়ি ধ্বংস করা হয়। গাড়িতে থাকা এক থেকে দেড়শত পাক সদস্যরাও নিহত হয়। হত্যাযজ্ঞ শেষে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা উত্তরের দিকে চলে যায় এবং আমরা বহুলাশ নিজ চোখে দেখি। পাক হানাদার বাহিনীরা যখন আমাদের গ্রামে ঢুকে তখন গ্রাম পুঁড়িয়ে দেয়, আমার সাথে তখন ৯ জন লোক ছিলো। তারা ৪ জনকে গুলি করে হত্যা করে, চারজনের একজনের দেহের রক্ত আমার শরীরে লাগে, পরে সেখান থেকে একটি গর্তে শুয়ে পড়ি। তারপর বিকাল ৫টা পর্যন্ত ওইখানে থাকি এবং ওইদিনই পাক বাহিনীরা গ্রাম থেকে চলে যায়। তিনি বলেন, ১১ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় টাঙ্গাইল। কিন্তু তখনও মির্জাপুর কিছু পাকসেনা ছিলো। তারা মির্জাপুর উপজেলা চত্বরে (সিও অফিস) অবস্থান নিয়ে আছে এমন সংবাদে ১৩ ডিসেম্বর আমরা মির্জাপুরে এসে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ করি। আক্রমণ করার পর পাক বাহিনীরা তাদের ক্যাম্প রেখে ঢাকার দিকে রওনা হয়। এরপরই ওইস্থানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করি, পর্যায়ক্রমে আমরা সকল দপ্তরে পতাকা উত্তোলন করি। আর এরই মাধ্যমে মির্জাপুর হানাদার মুক্ত হয়। সেই থেকে ১৩ই ডিসেম্বর দিবসটি আমরা ‘মির্জাপুর হানাদার মুক্ত’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছি।
প্রসঙ্গত, আজ সোমবার দিবসটি উপলক্ষে সকালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও সন্ধ্যায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালন করা হবে।





