করোনা মহামারীর বিরূপ পরিস্থিতিতেও দেশের অর্থনীতির বেশকিছু সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, পুঁজিবাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারা ও আমদানি বাণিজ্য সচল রয়েছে। এছাড়া কম মুনাফা সত্ত্বেও মানুষের সঞ্চয়প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকে আমানত বাড়ছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমেও ভালো মুনাফা এবং চলতি হিসাবে টাকার পরিমাণ বেড়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকাশিত ‘হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২০ অনুযায়ী ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিগত বছরের তুলনায় দুই ধাপ এগিয়ে এখন ১৩৩তম। যদিও করোনায় সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে মানুষের জীবন ও জীবিকায়, যা থেকে এখনো উত্তরণ ঘটেনি। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক খাত এখনো ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি। যার মধ্যে অন্যতম নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, মানুষের আয় কমে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি, নিম্নমুখী রপ্তানি আয়, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বিভিন্ন শিল্পের জন্য মেশিনারিজ এলসি না হওয়া এবং খেলাপি ঋণ ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি।
এসবের পরও সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি সঠিক পথেই রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শিগগিরই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের অগ্রগতি থেকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমরা সঠিক পথে রয়েছি।’ গত ২০ জানুয়ারি (বুধবার) জাতীয় সংসদে চলমান শীতকালীন অধিবেশনে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। প্রতিবেদনে তিনি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, রাজস্ব পরিস্থিতি, বাজেট ভারসাম্য ও অর্থায়ন, মুদ্রা ও ঋণ পরিস্থিতি, বৈদেশিক খাত, মূল্যস্ফীতির অবস্থা তুলে ধরেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা মহামারী সত্ত্বেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমরা ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছি। বাস্তবমুখী ও পর্যাপ্ত প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার বর্তমান অর্থবছরে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিসঞ্চার, কর্মসৃজন ও কর্মসুরক্ষা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে পেরেছে।’
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারের সাফল্য আরো বেশি হতো, যদি প্রণোদনার অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য না হতো, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মালিকদের প্রণোদনা যথার্থ পরিমাণে দেওয়া হতো এবং গার্মেন্ট শিল্পে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে সেগুলো বিনিয়োগ হতো। এসব না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূরীকরণে ভূমিকা রাখতে পারেনি।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘করোনার মাঝেও কৃষিতে খাদ্যশস্য উৎপাদন, রেমিট্যান্স আহরণ এবং পোশাক শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সাফল্য রয়েছে।’ কিন্তু যেসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে সেসব কতদিন স্থায়ী হবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘নেতিবাচক এবং ইতিবাচক দু-ধারাতেই রয়েছে অর্থনীতি। তবে যতটুকু ইতিবাচক আছে তা কতটুকু টেকসই হবে সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’ এছাড়া বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, চিকিৎসা, সুশাসনের ক্ষেত্রে নিদারুণ ব্যর্থতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যর্থতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত না করলে যতটুকু সাফল্য তাও টিকবে না।’
তিনি বলেন, ‘এসএমই খাতে যথামাত্রায় ঋণ দেওয়া হয়নি। ফলে ছোট ও মাঝারি শিল্প পুঁজির অভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এটি আর্থিক খাতের অদক্ষতা। গার্মেন্ট সেক্টরে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে সেগুলো বিনিয়োগে রূপান্তর হয়নি। সরকারের জরুরি প্রণোদনা সহায়তার ক্ষেত্রে পূর্বপ্রস্তুতি না থাকা এবং দুর্নীতির কারণে প্রণোদনা সবার কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।’
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির যেসব সূচক ভালো অবস্থায় নেই, সেগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ অন্যতম। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হলে একসঙ্গে সবকটি সূচকই ঘুরে দাঁড়াবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলছেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি চলছে, আগামী মার্চ পর্যন্ত তা এভাবেই যাবে। এরপর আগামী জুলাই-আগস্টের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো থেকে কেনাকাটা, ভ্রমণ, ভোগ ব্যয় বাড়তে থাকবে। তখন আমাদের রপ্তানি ও শ্রমবাজার আবার ঘুরে দাঁড়াবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি বছরের ২০ জানুয়ারিতে ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণেই রিজার্ভ এমন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সবশেষ গেল ডিসেম্বরে দেশে এসেছে ২০৫ কোটি ৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাই-ডিসেম্বর এই ছয় মাসে দেশে মোট এক হাজার ২৯৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। এছাড়া করোনাভাইরাস মহামারীর মাঝেই চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশে এ যাবতকালের রেকর্ড ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে দেশে। অর্থনীতির ইতিবাচক সূচকের অন্যতম আমদানি বাণিজ্য সচল হওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত নভেম্বরে আমদানিতে প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসের চেয়ে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি। যদিও অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। হতাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শেয়ার বাজারও নতুন বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূলধনে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। আর গত ছয় মাসে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। ডিএসইতে বাজার মূলধন পাঁচ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে টেকসই হবে পুঁজিবাজার।
এছাড়া ব্যয় বাড়লেও মানুষের আগের চেয়ে সঞ্চয়প্রবণতা বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকগুলোয় আমানত বেড়েছে ৯৮ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রথম পাঁচ মাসেই (জুলাই থেকে নভেম্বর) ১৯ হাজার ৪৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বাণিজ্য ঘাটতিও। গত অর্থবছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের (৫৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলার) বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অর্থবছর শেষ করলেও চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) জুলাই-অক্টোবর সময়ে তা কমে ৩২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। এই বাণিজ্য ঘাটতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার কম।
তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এমনিতেই করোনার আগে ও পরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি না হওয়ায় এই হতাশা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, নভেম্বর মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কম। ব্যাংক কর্মকর্তারা এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের ইতিহাসের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি বলছেন। গত এক বছরে সবগুলো ব্যাংক মিলে এক লাখ কোটি টাকাও ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ এজন্য আর্থিক খাতের অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসএমই খাতে লোন দিয়েছে কিন্তু তা বিতরণ হয়। কিছুটা দিয়েছে কিন্তু যথামাত্রায় এবং যথাসময়ে দেয়া হয়নি। ফলে ঋণের অভাবে বিভিন্ন সেক্টর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এটার কারণ হলো আর্থিক খাতের অদক্ষতা এবং মনিটরিংয়ের ব্যর্থতা।’
মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যতম খাত রপ্তানিতে ধস নেমেছে। করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রভাবে ইউরোপের রপ্তানি বাজারের দ্বার এখনো খোলেনি। বিদায়ী বছরের শেষ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৩১ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের চেয়ে ৬ দশমিক ১১ শতাংশ কম এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ।
সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি ইতিবাচক ও নেতিবাচক ধারায় এগিয়ে চলেছে। নেতিবাচকতাকে ইতিবাচকতায় ফিরিয়ে আনতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সরকারের প্রণোদনা সহায়তাকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিলি-বণ্টনের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। নইলে যেসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে সেগুলোও বেশিদিন স্থায়ী হবে না বলে সতর্ক করেছেন তারা।





