সারা দেশ

খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে

মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষ

  • ''
  • প্রকাশিত ১৪ মে, ২০২৪

বিশেষ প্রতিনিধি:

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতির জ্বরে কাঁপছে দেশ। আর মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ, কোনোটি আবার তিনগুণ। এরমধ্যে এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার ১০ শতাংশের ওপরে উঠল। সার্বিক পরিস্থিতিতে পণ্যের দামে লাগাম টানাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ভোক্তাবান্ধব নীতি সহায়তা না নিলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয় বলে মত তাদের।

নিত্যপণ্যের বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে ভোক্তাদের নিত্য হাহাকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ তথ্য বলছে, দুই অংকের খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে নেমেছে এক অংকের ঘরে। তবুও বাজারে নেই তার কোনো প্রভাব। এর মধ্যে চার মাস পর খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে উঠেছে। এর আগের মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তার আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ চার মাস পর খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার দশ শতাংশ ছাড়াল। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এপ্রিল মাসে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, গত মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মার্চ মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এ দিকে গত এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে। আগের মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির হালনাগাদ তথ্য বলছেÑ প্যাকেট আটা কিনতে ভোক্তাদের গুণতে হচ্ছে ৬৫ টাকা। অথচ বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদের শুরুতে যে আটা পাওয়া যেত ২৮ টাকা কেজিতে। একইভাবে ৯৫ টাকার সয়াবিন তেল কিনতে এখন গুনতে হচ্ছে ১৭০ টাকা। ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের মতো অনেক পণ্য কিনতেই ভোক্তাদের পকেট থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।

একটি কারখানার শ্রমিক হাজেরা বেগম ও তার স্বামী আলপন মিয়া জানান, তারা দুইজন মিলে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা আয় করেন। কিন্তু এই আয় গ্রামে তাদের দুই সন্তানের স্কুলের খরচ, পরিবারের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট নয়।

রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে সাড়ে তিন হাজার টাকা বাসাভাড়া, খাওয়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, যাতায়াতের খরচের পর তাদের গ্রামে পাঠানোর মতো খুব সামান্য টাকাই থাকে। পাঁচ বছর আগেও কম আয় করলেও সঞ্চয় করতে পারতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাদের আয় না বাড়লেও জানুয়ারি থেকে ভাড়া বেড়েছে ৭০০ টাকা। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আবারও সামনের মাস থেকে ভাড়া বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

আলপন মিয়া বলেন, মুদি দোকান থেকে জিনিস কেনার জন্য আগে ২০০ টাকাই যথেষ্ট ছিল। এখন ৫০০ টকাও কম। হাজেরা বেগম জানান, তাদের খাবারে তালিকায় থাকে সপ্তাহে দুই বার সস্তার মাছ এবং বেশিরভাগ দিন ভাতের সঙ্গে শুঁটকি, ডাল আর ডিম।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের কাছে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূর্ব শেওড়াপাড়ায় সরকারের খোলা বাজার বিক্রয় কর্মসূচির একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানের কর্মী মোহাম্মদ হাসান বলেন, যেহেতু আমাদের ট্রাক থেকে যে কেউ পণ্য কিনতে পারেন, তাই দরিদ্রদের পাশাপাশি এখন অনেক বাড়ির মালিক এবং মধ্যবিত্তরাও আজকাল আমাদের দোকানের পেছনে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

গরু ও খাসির মাংস বেশ অনেকদিন ধরেই নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। গরুর মাংসের দাম দুই মাস আগের কেজিতে ৬৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮০০ টাকায় এবং খাসির মাংস এখন ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বেড়েছে মুরগির দামও। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিম এখন প্রতি ডজন ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগের দামের চেয়ে প্রায় ৫ টাকা কম। আয়-ব্যয়ের সমন্বয় না হওয়ায় জীবন-যাপনে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ থাকলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না। এ অবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ চান বেসরকারি চাকরিজীবীরা।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় জিরার দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ। বিদ্যুতের আসন্ন দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পেট্রোবাংলার সাবেক কর্মকর্তা মাহবুবা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ বিল বাড়লে প্রায় সব কিছুরই দাম বেড়ে যায়। এ বিষয়ে সরকারকে আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, নানা কারণে বর্তমানে দেশে ডলারের তীব্র সংকট চলছে। এক ডলার কিনতে এখন খরচ করতে হচ্ছে ১২০ টাকার ওপরে। অর্থাৎ স্থানীয় টাকার মান কমছে আর ডলার রকেট গতিতে ছুটছে। ডলার নিয়ে এমন সংকট আগে কখনই দেখা যায়নি দেশে। ফলে ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারে অস্থিরতা চলছে। বিনিময় হার বাজারের উপরে ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেন, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে হলে বিনিময় হার স্থিতিশীল করা আবশ্যক।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি এক ধরনের কর, যা ধনী-গরিব-নির্বিশেষে সবার চাপ বাড়ায়। আয় বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়ে গেলে গরিব ও মধ্যবিত্তের সংসার চালাতে ভোগান্তি বাড়ে। এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশ চড়া। তার সঙ্গে চিকিৎসা, পরিবহনসহ খাদ্যবহির্ভূত খাতেও খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, এই মুহূর্তে নিম্ন আয়ের মানুষেরা অনেকটা কষ্টে আছে। মূল্যস্ফীতিতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অধিক সংখ্যক প্রান্তিকজনকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং সহায়তা হিসেবে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত নিত্যপণ্যের পরিমাণ, ন্যায্য মূল্যনির্ধারণ, এবং দুর্নীতিমুক্তভাবে বিতরণের পাশাপাশি কীভাবে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত রাখা যায়, সেই চেষ্টা সরকারের পক্ষ থেকে অব্যাহত রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের দিকে ইঙ্গিত করবে সরকার। আমরা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছি এবং কুইক রেন্টাল পাওয়ার নিয়েছি। এগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতার প্রমাণ দেয়। আমি সরকারকে অনুরোধ করছি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে, অপচয় বন্ধ করতে এবং এই খাতে স্বচ্ছতার অভাব দূর করতে।

সাবেক তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ নয়, এটা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ভোক্তাবান্ধব নীতি ছাড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য দেশের মূল্যস্ফীতির হার অনেকাংশে বৃদ্ধি করছে। এদের লাগাম টেনে ধরতে হবে, থামাতে হবে এদের বেপরোয়া গতি। তারা কৃত্রিমভাবে বাজারে পণ্য সরবরাহ সংকুচিত করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কার্যকরী বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফামুখি প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads