দেশে বর্তমানে ছয়টি রুটে মোট ৫৩টি ফেরি চলাচল করছে। এর মধ্যে ২৬টিই মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ৪৭টির নেই ফিটনেস সনদ। আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪০ বছরের বেশি বয়সি নৌযান চালানোর সুযোগ না থাকলে ৯৫ বছর বয়সি ৫টি ফেরিও এখনো চলাচল করছে। সরকারি সংস্থা নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিসি ফেরি পরিচালনার দায়িত্বে থাকায় নেওয়া হয় না কোনো আইনি ব্যবস্থা। ফলে প্রায়ই ঘটছে ফেরি দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গতকাল বুধবার পাটুরিয়া ঘাটে ডুবে যাওয়া ফেরিটিও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে এক বছর আগে।
বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চলাচলের ঝুঁকির ব্যাপারটি অবহিত করে ডিওএস কর্তৃপক্ষকে ধারাবাহিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যদিও অধিদপ্তর থেকে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরির ব্যাপারে দুই-তিন মাস পরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমলে না নিয়ে চিঠি ফেলে রাখে। ফলে চিঠির পর চিঠি দিয়েও ফেরি পরিবর্তন করা যায়নি।
জানা গেছে, পাটুরিয়ায় ডুবে যাওয়া আমানত শাহ ফেরিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে এক বছর আগে। ১৯৮০ সালে ডেনমার্ক থেকে কেনা ফেরিটি। জাহাজ চলাচল আইন অনুযায়ী ৪০ বছর পার হলেই তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। কিন্তু আইনের কোনো তোয়াক্কা না করেই যাত্রী ও পণ্য পারাপার করা হচ্ছিল।
এদিকে, দেশে প্রতিটি ফেরি চলাচলের জন্য আইনে অনুমোদিত মেয়াদ ৩০ বছর। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর (ডিওএস) থেকেও ফেরিগুলো এ মেয়াদে চলাচলের শর্তেই অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন আইন ১৯৭৬ অনুযায়ী নির্ধারিত এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংস্কার সাপেক্ষে দুই মেয়াদে (পাঁচ বছর করে) আরো ১০ বছর পর্যন্ত ফেরির নিবন্ধন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে বর্ধিত এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ফেরিটি আর কোনোভাবেই চালানো যাবে না বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টার মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চালালে তাকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তারপরও আইন লঙ্ঘন করেই নৌরুটগুলোয় মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চলাচল করছে। অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ২৬টি ফেরির ২০টিরই বয়স চল্লিশের বেশি। যদিও এসব ফেরি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নন ফেরির মাস্টার বা চালকরা।
মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরিগুলো হলো- ফেরি কর্ণফুলি, ফেরি ঢাকা ও ফেরি কুমিল্লা বয়স ৫৮ বছর। ফেরি কুমারী, ফেরি করবী ও ফেরি কন্তরী বয়স ৪৯ বছর। ফেরি কেতকী বয়স ৪৮ বছর। ফেরি কাকলী, ফেরি কামিনী, ফেরি কিশোরী, আইটি ৮-৩৯০ ও ফেরি ফরিদপুর বয়স ৪৭ বছর। ফেরি কপোতী, আইটি ৮-৩৯১, আইটি ৮-৩৯৪ ও আইটি ৮-৩৯৫ বয়স ৪৬ বছর। আইটি ৮-৩৯৬ ও আইটি ৮-৩৯৭ বয়স ৪৫ বছর। ফেরি আমানত শাহ ও ফেরি শাহজালাল বয়স ৪১ বছর। ফেরি শাহ আলী ও ফেরি শাহ মখদুম বয়স ৩৭ বছর। ফেরি শাহ পরান ও ফেরি খানজাহান আলী বয়স ৩৪ বছর। ফেরি এনায়েতপুরী ও ফেরি কেরামত আলী বয়স ৩৩ বছর। এ ছাড়া ১৯২৫ সালে তৈরি পাঁচটি ফেরি বয়স হয়েছে ৯৫ বছর। এগুলো হলো- টেপলো, রায়পুরা, রানীগঞ্জ, রানীখাত ও রামসিরি। এ ফেরিগুলো এতদিন শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল করত। সম্প্রতি পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কা লাগার ঘটনার পর এসব ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে মেয়াদ রয়েছে এমন ফেরিগুলোর মধ্যে রো রো বা বড় ফেরি ছয়টি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর, বীরশ্রেষ্ঠ বরকত, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও গোলাম মাওলা। এর মধ্যে জাহাঙ্গীর ও বরকত ফেরি দুটির ৩০ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র এক বছর বাকি রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে বিআইডব্লিউটিসির বহরে চারটি নতুন ফেরি যোগ হয়েছে। এগুলো হলো বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, কদম ও কঞ্জুলতা।
ফেরিঘাটের বেশ কয়েকজন মাস্টার জানিয়েছেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চালানোর আইনি দিক সম্পর্কে কোনো কিছুই জানা নেই তাদের। এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক মাস্টার বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাদের সচল ফেরি দেন। আমরা ফেরি চালাচ্ছি। এর বেশি কিছু আমাদের জানা নেই। তবে দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরি চালানো নিয়ে মাস্টারদের মধ্যে বেশ ক্ষোভ রয়েছে। এ নিয়ে আমাদের অবস্থান থেকে কথাও বললে চাকরি থাকবে না।
মাওয়া ঘাটের এক ফেরিচালক বলেন, কোনো মাস্টারই ইচ্ছে করে দুর্ঘটনা ঘটান না। অথচ দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হলে মাস্টারদেরই দায়ী করা হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই উদ্যোগ নিলে অযথা মাস্টারদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর প্রয়োজন পড়ত না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ বদরুল হাসান লিটন বলেন, আমাদের দেশে বিশেষ বিবেচনায় কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চলছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ম হলো ৪০ বছরের পর কোনো নৌযানকেই ফিটনেস না দেওয়া।
মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চালু রাখার কারণ জানতে চাইলে বিআইডব্লিটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মেরিন) একেএম শাহজাহান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি চালানোর বিধান না থাকলেও যাত্রীদের কথা বিবেচনায় রেখে ফেরিগুলো সচল রাখা হয়েছে। হঠাৎ করে এতগুলো ফেরি বন্ধ করে দিলে তখন জনভোগান্তি আরো বাড়বে। ফেরিগুলো ফিটনেস পরীক্ষা করেই সচল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ফেরিও যুক্ত করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে কিছু ফেরি অনেক পুরাতন। তবে প্রধানমন্ত্রী একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। আগামী জানুয়ারি ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১২টা নতুন ফেরি পেয়ে যাব।





