সম্পাদকীয়

ম্যাখোঁর রাজনৈতিক বৈপরীত্য

  • প্রকাশিত ৮ নভেম্বর, ২০২০

আল আমিন ইসলাম নাসিম

 

 

২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি পদপার্থী হিসেবে ফরাসি রাজনীতিবিদ ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছিলেন যে, প্রত্যেকে যেন মর্যাদা বজায় রেখে তার ধর্ম পালন করতে পারে, তা আমাদের কর্তব্য (২৫ এপ্রিল ২০১৭, রয়টার্স থেকে সংগৃহীত)। কিন্তু বর্তমানে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ম্যাখোঁ পবিত্র ইসলাম ধর্মের পথপ্রদর্শক, শেষ নবী ও রাসুল (সা.)-কে নিয়ে যখন বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, তখনই ঠিক বুঝে ওঠা অতি সহজ হয়ে যায় যে প্রত্যকের ধর্ম প্রত্যকে পালনের প্রতিশ্রুতিতে কতটুকু কর্তব্য পালন করতে পেরেছে সে?

ম্যাখোঁর জনপ্রিয়তা এখন ফরাসিবাসীদের কাছে কমে আসছে এবং সে জন্যই বর্তমানে ফ্রান্সে চলমান শার্লি এবদোর ঘটনাকে পুঁজি করে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব প্রচারণা চালিয়ে নিজ রাষ্ট্রের জনগণের মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। একে জনতুষ্টবাদী রাজনীতিও বলা চলে। যে দেশ সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এগিয়ে চলছিল, সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হঠাৎ ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছেন কেন? হঠাৎ করে কেনই বা ইউরোপের উদারতম রাজনৈতিক নেতা থেকে জনতুষ্টবাদী নেতা হলেন ম্যাখোঁ বা হঠাৎ করে তার এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য কেন?

মূলত ২০১৬ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ফ্রান্সে পুলিশ অভিযানের সময় মুসলমানদের ওপর নির্যাতন এবং নিপীড়নের অভিযোগ করে। ২০১৬ সালের নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ৩৫০০ মুসলিম বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। কিন্তু সন্ত্রাসবাদবিরোধী মামলা হয় মাত্র ৬টি। এরপর ২০০৫ সালের প্যারিসের গরিবদের অভ্যুত্থান ‘প্যারিস রায়ট’ এবং ২০১৯ সালের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন ছিল বামঘেঁষা। এক্ষেত্রে ডানপন্থিরা স্থির ছিলেন না। ফরাসি এলিট মহল নিজেদের শক্তি বাড়াতে ইসলামোফোবিয়ার জাল ছড়াল। তৈরি করা হলো মুসলিমবিরোধী প্রচারণা। এদেরই প্রতিনিধি হিসেবে উঠে এলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী বর্ণবাদী ল প্যেঁন। গরিব, অভিবাসী, তরুণদের জোটকে ছত্রভঙ্গ করতে অনেকটাই সফল হয়েছে এই মেকি মুসলিম সমস্যা। ফরাসি ডানপন্থিরা এই একরোখা চোখে ও পথেই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখছে। তারা দেখতে পাচ্ছে না যে রাষ্ট্রের মদতে ইসলাম বিদ্বেষের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোতে সামরিক হামলার পরিস্থিতিই জঙ্গিবাদের জন্মদাতা। এরই সাথে সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তুলে নিয়েছেন ফায়দা। বিশেষ করে ফ্রান্সের লড়াই ছিল পুঁজিবাদ বনাম জনতার। জনগণের আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে তিনি নিয়ে আসছিলেন ইসলামী বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব এবং মুসলিমবিরোধী আইন।

জাতীয়ভাবে চালানো আইপিএসওএসের জরীপ অনুযায়ী, ৭৮ ভাগ ফ্রান্সবাসী মনে করে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর আমলে ফ্রান্স পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২৭ ভাগ এতই উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে যে এই অধঃপতন আর ঠেকানো যাবে না বলছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর বেশি দিন নেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ তিনটি গুরুতর জায়গায় শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। করোনা মহামারী মোকাবিলা, (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতোই তার সরকার মাস্ক পরা জরুরি নয় বলে অপরাধমূলক অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত), ম্যাখোঁর ভুল অর্থনৈতিক নীতির জন্য ফরাসি অর্থনীতির ঐতিহাসিক মন্দা এবং ট্রাম্পের মতোই ফরাসি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা। এসবের পুরস্কার হলো ফ্রান্সের ইতিহাসের সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের খেতাব।

আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ম্যাখোঁর উদ্দেশ্য ছিল যে চলমান ফ্রান্সের রাজনীতি এবং জনমতকে উপেক্ষা করে ভিন্ন খাতে বা প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়া। তার অজনপ্রিয়তাকে জনপ্রিয় করার তাগিদে ধর্মীয় হাতিয়ার হিসেবে মুসলিম ধর্মকে ব্যবহার করার। যার ফলে ১ অক্টোবরের সন্ধিক্ষণে ইসলাম বিরোধী বিলও পাস করার সিদ্ধান্ত করেন। সর্বোপরি নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ সৃষ্টির লক্ষ্যে, জনসাধারণের নিকট জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য যেকোনো একটি সুযোগসন্ধানী হাতিয়ার যেন অত্যাবশ্যকীয় হয়ে যাচ্ছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর নিকট যেমন করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী মনোভাব প্রেষণ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা ফায়দা লোটার পাঁয়তারা চলছে, যেমনটি মার্কিনদের বর্ণবাদকে ঘিরে রাজনৈতিক ক্ষমতা লোটার পাঁয়তারা চলছে ঠিক তেমনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ দীর্ঘদিনের তার অজনপ্রিয়তা রোধে নিজ রাষ্ট্রের জনগণদের ইসলামবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে বা মনোভাব পোষণ করে স্বার্থসিদ্ধির কাজ চালাচ্ছে। এর পশ্চাতে আরো কিছু কারণ রয়েছে তা হলো ফ্রান্সের একচোখা ‘ইসলাম’ দর্শন। মুসলমানরা ফ্রান্সের মূল সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।

জনসংখ্যায় মুসলিমরা প্রায় ৭০ লাখ এবং শতকরা হিসাবে জনগণের সাড়ে ৭ শতাংশ। এরা মূলত ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ আলজেরিয়া, মরক্কো ইত্যাদি উত্তর আফ্রিকীয় দেশ থেকে আসা। ঔপনিবেশিক আমলে একসময় ফরাসি ভূখণ্ডে এসে পৌঁছায়। তথাপি এরা সংখ্যালঘু হওয়ায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর রাজনীতিতে বৈপরীত্য আসে। কেননা ৭ শতাংশের সঙ্গে বেমানান করলে ৯৩ শতাংশই তার অধিকারে হবে। ক্ষমতা তার পকেটে থাকবে। বিশ্বজুড়ে যে করোনারভাইরাসের সংকটের ফলে ইতোমধ্যে ম্যাখোঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছিল কেননা ট্রাম্পের মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সে নিতে পারিনি। পাশাপাশি যারা বাক্স্বাধীনতা কিংবা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে ফ্রান্সকে বাহবা দেয়, তাদেরও জানা প্রয়োজন যে ম্যাখোঁর ফলে ফ্রান্সের বেশ কিছু অঙ্গনে মতামত প্রকাশে বাধা দেওয়া দেখা যায়। সে জন্য জনমানসে ম্যাখোঁর রাজনৈতিক অঙ্গনে ভাঙন ধরে। সেই রাজনৈতিক ভাঙনের বাঁধ ঠেকাতেই নতুন ইস্যু (ইসলামবিরোধী মতবাদ তার জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রকাশ করে সমর্থন আদায়)। মূলত ইমানুয়েল ম্যাখোঁ প্রশাসন নিজ রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর প্রতি আপাতত সংহতি জানালেও নিজ রাষ্ট্রে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ছিল ক্ষুণ্ন। এ জন্য আগাম নির্বাচনকালীন ম্যাখোঁর প্রয়োজন ছিল জনতুষ্টবাদী সমর্থন আদায় এবং ক্ষমতার মসনদে বসার। আর বলা যেতে পারে, সে জন্যই মূলত ম্যাখোঁ ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের জোরদার প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং যা রাজনৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। তবে ইমানুয়েল ম্যাখোঁর রাজনৈতিক বৈপরীত্যের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামীতে ফ্রান্সকে কোন দিকে নিয়ে যাবে এবং মধ্যেপ্রাচ্যে ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক কেমন সখ্য হবে সে প্রশ্ন রয়েই যায়?

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads