মুক্তমত

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ত্রিপরাশক্তির উত্থান

  • প্রকাশিত ১৪ মার্চ, ২০২১

আল আমিন ইসলাম নাসিম

 

 

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বারা সংঘটিত বেপরোয়া কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিকট মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া শুরুতেই বাইডেনের বিধিনিষেধ ও কড়া পররাষ্ট্রনীতির ফলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ত্রিপরাশক্তির জোট (চীন-রাশিয়া-তুরস্ক)। তবে ইরানকে সেই জোটের সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে ধরা যেতে পারে। পরন্তু এই ত্রিপরাশক্তির উত্থান অনেকটা কোয়াডের (অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট ‘কোয়াড’) বিপক্ষেই বলা যেতে পারে। কেননা ত্রিপরাশক্তির মধ্যে একটি হচ্ছে চীন এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি মোকাবিলা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট ‘কোয়াড’ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

কিছুদিন পূর্বে টোকিওতে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠক করেছেন এবং সেখানে তারা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানে বহুপক্ষীয় সুরক্ষাবলয় গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে আবার টেলিফোন বার্তায় চীনের আগ্রাসী নীতিমালা দমনে, অর্থনৈতিক বিষয়ে একচেটিয়া বাজার দখল, উইঘুরে সংখ্যালঘুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন ও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন ইত্যাদি বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন সতর্ক করে দিয়েছেন বেইজিংকে।

এ ছাড়া ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন রণতরি বেইজিং-ওয়াশিংটনের মধ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে। ফলে চীন, রাশিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে আঁতাতে জড়িয়ে যাবে ঘনিষ্ঠভাবে। এরই মাঝে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন জানিয়েছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী সেপ্টেম্বরে রাশিয়া সফরে আসছেন। শি জিনপিং রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ভলাদিভস্তকে একটি অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেবেন। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে রাশিয়া এবং চীন উভয় দেশ। এর ফলে দুই দেশই একে অপরের আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করবে বলে মনে করা যায়। এ ছাড়া চীনের অর্থনীতি, প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও রুশদের বানানো যন্ত্রপাতি, সব মিলিয়ে দুদেশের সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি বড় কিছু ঘটার আশঙ্কা অমূলক নয়।

অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তালে-বেতালে মিলিয়ে চললেও বাইডেন প্রশাসন সরাসরি মস্কোকে সতর্ক বাণী প্রদান করেছেন। বাইডেন-পুতিনের প্রথম ফোনালাপেই উঠে এসেছে মনকষাকষির আলাপচারিতা। বাইডেন মস্কোর সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র চুক্তি ও ওবামা ক্ষমতায় থাকাকালীন করা ‘নিউ স্টার্ট’ নামের একটি চুক্তি নতুন করে নবায়ন করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রাগারে মিসাইল, লঞ্চর ও ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা সীমিত করার বিষয়ে উল্লেখ ছিল।

অন্যদিকে আবার বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মস্কোর হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যদিও এতে মস্কো তীব্র নিন্দা জানায়। এ ছাড়া বাইডেন মস্কোর বিরুদ্ধে ‘সোলার উইন্ডস’ সাইবার হামলা, আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলায় রাশিয়ার উসকানির অভিযোগ ও পুতিনবিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে বিষপ্রয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। সুতরাং এর ফলে ওয়াশিংটন-মস্কোর সম্পর্কের মধ্যে মারাত্মক ফাটল সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আবার রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে ইরান। পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই তেহরান ওই দুই দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

ভোটের আগে জো বাইডেন বলেছিলেন, ক্ষমতায় এসে ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরাবেন। তবে ক্ষমতায় আসার পর তিনিও ইরানের প্রতি কড়া অবস্থান নিয়েছেন। কার্যত কিছুদিন আগে একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরের উত্তরাঞ্চলে এবং ওমান সাগরের ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে ইরান ও রাশিয়ার যৌথ নৌমহড়া। দুদিনের এই যৌথ নৌমহড়ার কয়েকটি উদ্দেশ্য হলো-দুদেশের নৌবাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উদ্ধার অভিযানের প্রশিক্ষণ। এভাবেই চক্রাকারে ঘুরছে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়া-ইরানের সম্পর্ক।

গত দুই দশকে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন বাঁক বেশ লক্ষণীয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে রিপাবলিক গঠিত হওয়ার পর পশ্চিমাদেরই অনুসরণ করেছে তুরস্ক। এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপক পরিবর্তন করেন। তুরস্ক এখন আর পুরোপুরি পশ্চিমা বা ন্যাটোনির্ভর নীতি অবলম্বন করছে না। মার্কিন প্রভাবের বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান সংহত করার চেষ্টা করছে। এ থেকেই বোঝা যায় নতুন করে পরাশক্তির উত্থান ঘটাতে সদা তৎপর ও প্রস্তুত তুরস্ক। তবে যাহোক ন্যাটোর সদস্য তুরস্ককে তুরুপের তাস হিসেবে মনে করছে মস্কো। কেননা রাশিয়ার ‘এস ৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জোট বাঁধছে আঙ্কারা-মস্কো। যদিও ওয়াশিংটন তুরস্কের এই ‘এস ৪০০’ মস্কোর কাছে ফেরত দিতে বললেও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পক্ষে সম্মতি জ্ঞাপন করেনি।

এ ছাড়া ইরাকে ১৩ তুর্কি নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের জের ধরে আমেরিকানদের প্রতি তীব্র নিন্দা জানায় এরদোয়ান প্রশাসন। এর দরুণ মনকষাকষিও চলছে দু’রাষ্ট্রের মাঝে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এরদোয়ান প্রশাসন ওয়াশিংটনের কাছে জবাবদিহিতাও চেয়েছে। এদিকে ন্যাটোর সদস্য হয়েও রাশিয়া-চীনের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে তুরস্ক। ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক চাপাচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। এদিকে আমেরিকার দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য তুরস্ক একাই দায়ী। সবমিলিয়ে বলা চলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিমালার কারণে তুরস্ক নিজেকে সামরিক অস্ত্রে সুসজ্জিত করছে। এতে যেমন বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি হিসেবে তুরস্কের উত্থান ঘটছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন কমিয়ে এনে চীন-রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে।

আর এতেই এক ঘরোয়া হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে। পক্ষান্তরে বলা যায়, ট্রাম্প মস্কো-আঙ্কারা-তেহরান-বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে যে নীতি কায়েম করেছিল, এর থেকেও বেশি আগ্রাসী নীতিমালা কায়েম করতে যাচ্ছে বাইডেন। আর এই আগ্রাসী নীতিমালার ফলেই ত্রিপরাশক্তি জোট বাঁধছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্পূরক হিসেবে ইরানসহ অন্যান্য রাষ্ট্র তো আছেই। কার্যত এই ত্রিপরাশক্তির উত্থানে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এক নতুন ধামাকা অপেক্ষা করছে বিশ্ববাসীর নিকট তা বলা যায়। তবে বাইডেন প্রশাসন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তিনি বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে সেই চির দুর্বার আমেরিকাকে যে-কোনো মূল্যে ফেরত আনবেন। তবে বিশ্ব রাজনীতিতে ত্রিপরাশক্তির উত্থান যেমন বিশ্বে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটাতে সদা তৎপর এবং নয়া আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে, ঠিক তেমনি মার্কিনিদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোটাদাগে এই উদ্বেগের অন্যতম কারণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট।

কেননা এই ত্রিপরাশক্তির একটি রাষ্ট্র ‘চীন’ ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও সন্ধি করে নিয়েছে। এখন কোণঠাসা বাইডেন প্রশাসনের নিকট সবচেয়ে বড় চ্যলেঞ্জ হচ্ছে ত্রিপরাশক্তির উত্থানের কারণে বিভিন্ন চুক্তিতে ফেরত গিয়ে রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপন করা। কেননা এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই নিঃসঙ্গ ও নিঃস্ব বলা চলে (যদিও কোয়াড, ন্যাটো ভরসা)। কার্যত, একুশ শতকের এই সময়ে প্রযুক্তির চেয়ে স্নায়ুযুদ্ধ কিংবা অর্থনৈতিক যুদ্ধ বেশি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা যায়। তবে যাহোক, এই ত্রিপরাশক্তির উত্থানে মার্কিনিদের ব্যাপক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। সর্বোপরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিজ্ঞ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিশ্বরাজনীতিতে ত্রিপরাশক্তির উত্থান দমনে কেমন নীতিমালা গ্রহণ করেন তা অদূর ভবিষ্যৎ‌ই বলে দেবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads