বৈরী আবহাওয়া কিংবা কারিগরি কোনো জটিলতা তৈরি না হলে আজই বসবে পদ্মা সেতুর সর্বশেষ ৪১তম স্প্যানটি। এর মধ্য দিয়ে স্বপ্নের এই সেতুর সবচেয়ে জটিল ধাপ সম্পন্ন হবে। এর পর বাকি থাকবে রোডওয়ে স্ল্যাব, রেলওয়ে স্ল্যাব, গ্যাস পাইপলাইন, প্যারাপেটওয়াল বা রেলিং, ভায়াডাক্ট, গ্যাসলাইন, ৪০০ কেভিওয়াটের বিদ্যুৎ লাইনসহ আনুষঙ্গিক কাজ। তবে দ্রুতগতিতে চলছে এসব কাজ। গতকাল বুধবার ভাসমান বড় ক্রেনের মাধ্যমে স্প্যানটি উঠিয়ে যেখানে বসানো হবে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাতে স্প্যানটি সেখানেই থাকবে। আজ স্প্যানটি ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটিতে (পিলার) স্থাপন করা হবে। ৪১তম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মার দুই পাড় অর্থাৎ মাওয়া ও জাজিরা যুক্ত হয়ে যাবে এবং সেতুর নদীর অংশের ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ঘন কুয়াশার কারণে সর্বশেষ স্প্যান খুঁটিতে বসানো কিছুটা কঠিন হতে পারে। এ কারণে স্প্যানটি আগেই খুঁটির কাছে নিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে স্প্যানটি আজ সহজেই স্থাপন করা যায়। পদ্মা সেতুর সর্বশেষ, অর্থাৎ ৪১ নম্বর স্প্যানটি বসবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে। মাওয়ার কুমারভোগের নির্মাণমাঠে যেখানে স্প্যান প্রস্তুত করা হয়, সেখান থেকে এটি বসানোর খুঁটি খুব বেশি দূরে নয়। এ জন্য কুয়াশা থাকলেও বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। গত দুই মাসে ১০টি স্প্যান বসানো হয়েছে। বাকি ৩০টি স্প্যান বসাতে তিন বছর লেগে যায়। সরকার আগামী বছর ডিসেম্বরে সেতুটি চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে সেতু সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে এখনো সন্দিহান। পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম টেলিফোনে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। করোনার টিকা যদি দ্রুত চলে আসে হয়তো সম্ভব হবে। তিনি জানান, করোনার কারণে অনেক বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ঠিকাদাররা আসতে পারছেন না। এ কারণে বর্তমানে মাত্র ৬০-৭০% সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদেরকে। কাজের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর কাজ সম্পন্ন করা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। প্রকল্প পরিচালক জানান, আগামী ১ বছরের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করতে আমাদের ওপর চাপ রয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, কবে নাগাদ সেতুর কাজ শেষ হবে সেটি এখনো আমরা নির্ধারণ করিনি। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা এ ব্যাপারে জানাতে পারব, ঠিক কবে নাগাদ কাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাবে।
সবশেষ স্প্যানটি বসানো হয়ে গেলে হাফ ছেড়ে বাঁচবেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। স্প্যান বসানোর এই ধাপটি ছিল প্রকল্পের সবচেয়ে জটিল প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটি অবশ্যই আমাদের জন্য একটি বড় সাফল্য। এখন অন্য যেসব কাজ বাকি রয়েছে সেগুলো সময়সাপেক্ষ হলেও ছোট কাজ এবং জটিল নয়। কিন্তু স্প্যান বসানোর কাজটিই ছিল খুব জটিল বিষয়।’
এদিকে, সবশেষ স্প্যানটি বসানোর ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সেতু বিভাগের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে সেসব কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। তাই অনেকটাই অনাড়ম্বরভাবে শেষ স্প্যানটি তোলার কাজ সম্পন্ন হবে। আগামীকাল শুক্রবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পদ্মা সেতু প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে পর্যালোচনা সভা করবেন। সেখানে তিনি তার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরবেন। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতুর স্টিলের স্প্যানের ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। নিচে স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলাচল করবে ট্রেন।
২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত সমীক্ষার পর ২০০৪ সালে মাওয়া-জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শ দেয় জাপানের দাতা সংস্থা জাইকা। ২০০৭ সালে একনেকে পাস হওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। এরপর ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি। ২০১৮ সালের জুনে আবারো ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে আরেক দফা প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই সেতু। জাপানি সংস্থা জাইকার সমীক্ষা অনুযায়ী, ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।





