জাতীয়

ঢাকা ছাড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ

যেভাবেই হোক যেতে হবে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৮ জুন, ২০২১

লকডাউন ঘোষণায় ঢাকা ছাড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।  স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়ে দিন এনে দিনে খাওয়া মানুষের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে লকডাউনে না খেয়ে থাকার ভয়। আয় না থাকলে চলবে কি করে। থাকা-খাওয়ার খরচ জোগাবে কোথা থেকে। এই দুশ্চিন্তায় তাদের ঘুম হারাম। ফলে যে করেই হোক গ্রামের বাড়ি পৌঁছাতে হবে। আজ সোমবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে সীমিত পরিসরে বিধিনিষেধ। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হলেও গতকাল রোববারও লোকজনকে রাজধানী ছাড়তে দেখা গেছে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকলেও নানা উপায়ে ঢাকা ছাড়ছেন তারা। যারা ঢাকা ছাড়ছেন, তারা জানেন না, কতদিন আর কতটা কঠোরভাবে পালন করা হবে লকডাউনের বিধিনিষেধ। সরকার কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেওয়ায় তারা মনে করছেন, গত বছরের লকডাউনের চিত্রই দেখা যাবে আবার। অনেকে ধরে নিচ্ছেন, এই লকডাউন টানা চলবে ঈদুল আজহা পর্যন্ত। তাই অধিকাংশই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা ছাড়ছেন। গতকাল রাজধানীর গাবতলী গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার কোনো বাস। তাই হেঁটে ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে হাজারো মানুষকে। কেউ কেউ আবার যাচ্ছেন ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে। দুই হাতে বড় দুই ব্যাগ নিয়ে হেঁটে গাবতলী থেকে আমিনবাজারের দিকে যাচ্ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমির হোসেন। কথা বলে জানা গেল যশোর যাবেন তিনি। সরাসরি কোনো বাস নেই। তবে হেঁটে আমিনবাজার পার হলে আন্তজেলা বাসে চড়ে ভেঙে ভেঙে পাটুরিয়া ঘাটে পৌঁছাবেন। তারপর আবারো হেঁটে ফেরি পার হয়ে ভেঙে ভেঙেই বাড়ি যাবেন।

এত কষ্ট করে কেন বাড়ি যাচ্ছেন প্রশ্ন করতে আমির হোসেন বলেন, ঢাকায় আমি ছোডখাডো ব্যবসা করি, মেসে থাকি খাই। লকডাউন পড়িলে ঘরে বসি থাকিলে আমারে খাওয়াবে কিডা কন দেহি? তারচে সুযোগ যেহেতু পায়েছি, ঈদ করি ঢাকায় ফিরবানে। ছাওয়ালডিও খুশি অবিনে। আয় রোজগার থাকবি না; আমারও খরচ বাঁচবিনে।

কাঁধে ব্যাগ আর বয়স্ক দাদির হাত ধরে আমিনবাজার ব্রিজ পার হচ্ছিল স্কুলছাত্রী মারিয়ম আক্তার। যাবে নাটোরের সিংড়ায়। কীভাবে যাবে জানতে চাইলে বলে, শুনেছি আমিনবাজার গেলে লোকাল বাস পাওয়া যাবে। বাস বদলে বদলে যাব। বয়স্ক দাদি এভাবে যেতে পারবে কি না জানতে চাইলে সে বলে, আমার আব্বু-আম্মু কয়েক দিন আগে বাড়ি গিয়ে লকডাউনে আটকা পড়েছেন। সামনে আবার লকডাউন দেবে। তাই আমি আর দাদি চলে যাচ্ছি। সবাই বাড়িতে ঈদ করব।

এক মাসের নবজাতক কোলে নিয়ে ঢাকা ছাড়ছিলেন এক দম্পতি। যে করেই হোক বাড়ি পৌঁছাতে হবে। কারণ লকডাউন শুরু হলে আর যাওয়া যাবে না। সন্তানকে নিয়ে তারা প্রথম ঈদ করতে চান পরিবারের সঙ্গে।

রাস্তায় দেখা মিলল সদ্য পাকস্থলির অপারেশন করা রোগী আকলিমা ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে কয়েক দিন আগে অপারেশন করিয়েছেন আকলিমা। তাকে আরো কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হতো। কিন্তু ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই। লকডাউনে বিপাকে পড়তে হবে। তাই ঝুঁকি নিয়েই সিরাজগঞ্জে রওনা হয়েছেন তারা।

পাবনাগামী দিনমজুর আলী হোসেনও ঢাকা ছাড়ছেন একই কারণে। তিনি বলেন, লকডাউনে কাম-কাইজ পামু কই? খাওন দিব কিডা? অহন সব লইয়া যাইগা, আবার ছাড়লে ডাহা আইসমুনে।

সীমিত পরিসরে লকডাউনের মধ্যেই কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকা ছাড়তে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। এতে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে চাপ বেড়েছে যাত্রীদের। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে ফেরিতে গাদাগাদি করে যাত্রীদের পদ্মা নদী পার হতে দেখা গেছে। কোনো ফেরি পাড়ে ভিড়লেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক সাফায়েত আহম্মেদ জানান, ১৪টি ফেরি জরুরি সেবার যানবাহন ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপারের জন্য ব্যবহূত হচ্ছে। পণ্যবাহী যানসহ প্রায় সাড়ে তিনশ’ যান শিমুলিয়া ঘাটে অপেক্ষায় আছে। নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরিগুলো নদী পারাপারে একটু সময় বেশি নিচ্ছে। আবার লঞ্চ চলাচলও বন্ধ আছে। যে কারণে ঘাটে যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি।

ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই বিভিন্ন বাহনে ভেঙে ভেঙে পৌঁছাচ্ছেন শিমুলিয়ায়। মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের চেক পোস্ট বসিয়ে ঘাটে আসার আগেই যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা পায়ে হেঁটে ঠিকই ফেরিতে পৌঁছে যাচ্ছেন।

মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক জাকির হোসেন বলেন, যাত্রীদের ঘাটে আসা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে গত দুদিনের তুলনায় আজ (গতকাল) মানুষের চাপ বেড়েছে।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়,  কেউ হেঁটে, কেউবা রিকশায় পার হচ্ছেন মোড়। সেখান থেকে আবার তারা চড়ছেন ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহনে। অনেকে উঠে পড়ছেন ট্রাক ও পিকআপের পেছনে। এই মোড়ের দুই পাশেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। প্রচুর মানুষ বিভিন্ন যানের জন্য অপেক্ষা করছেন। অধিকাংশই বাড়ির পথ ধরছেন। কেউ কেউ রাজধানীতে চিকিৎসক দেখানো, ব্যবসার কাজে এসে বাড়ি ফিরছেন।

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে যাওয়ার জন্য নাদিয়া আক্তার দেড় ঘণ্টা যাবৎ সাইনবোর্ড মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানান, মোটরসাইকেলে দাউদকান্দি ৩০০ টাকা ভাড়া চায়। আর মাইক্রোতে ভাড়া চায় ৪৫০ টাকা।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা রুবেল হোসেন। চারদিন আগে শনিরআখড়ায় বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। আজ (গতকাল) বাড়ি যাবেন। দুই ঘণ্টা যাবত গাড়ির জন্য সাইনবোর্ডে অপেক্ষা করছেন।  কিন্তু যেতে পারছেন না। গাড়ি ও বাইক চালকরা বেশি ভাড়া চায়।

নারায়ণগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার অমৃত সূত্রধর গণমাধ্যমকে বলেন, সড়কে মানুষের চাপ অনেক বেশি। সবকিছু বন্ধ হওয়ার আগে মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যেতে চাইছে। এ কারণেই সড়কে প্রচুর মানুষ। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কোনো বাসকে সাইনবোর্ড পার হতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে পিকআপ, ট্রাকসহ পণ্যবাহী যান ছাড়া হচ্ছে। রোগী, জরুরি সেবা, বিদেশগামী ব্যক্তিদের যেতে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, মাইক্রোবাস, পিকআপ বা মোটরসাইকেলে করে অনেকে যাচ্ছেন। পুলিশ সদস্যরা চেকপোস্টে জিজ্ঞাসা করছেন। জরুরি কারণ দেখাতে না পারলে অর্থদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads