এক বা সিলেকটেড কিছু দলের বৃত্তবন্দি গণতন্ত্র দেশের জন্য কী পরিণতি ডেকে আনে- এর নমুনা গত বছরকয়েক ধরে দেখছে মানুষ। বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত দেখেছে একভাবে। নৌকা, লাঙল, ঈগল, ট্রাকের সাজানোতন্ত্রে এখন দেখছে কিছুটা আরেকভাবে। দূরদৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তা উপলব্ধি করেছিলেন আরো কত আগে। সেই উপলব্ধিতে থেকেই ডান, বাম, মধ্য মিলিয়ে ১৯৭৭ সালে তার বহুদলীয় চেতনায় দৃঢ়তার সঙ্গে বিএনপি গঠন। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অভিযাত্রা। রাজনীতির দর্শন প্রশ্নে তিনি এখন আরো প্রাসঙ্গিক। বাঘা বাঘা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে তাই জিয়াউর রহমান এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রচিন্তক। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস তিনি তৈরি করেছেন, চর্চাও করেছেন। যা তাকে নিয়ে গেছে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে। আর সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম, পরিশ্রম, নেতৃত্বের দৃঢ়তা তাকে দিয়েছে ভিন্ন উচ্চতা। বিনা ভোট, রাতের ভোট শেষে আজকের ডামি গণতন্ত্রের শিকার রাজনৈতিক অঙ্গন তাই জিয়াকে করে তুলেছে আরো স্মরণীয়-বরণীয়।
একজন পেশাদার সৈনিকের বহুদলীয় রাজনীতির ওই রাষ্ট্রচিন্তা নতুন করে এখন পাঠ-পঠনের বিষয়। মাত্র সাড়ে তিন-চার বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। জাত রাজনীতিক না হয়েও তার রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানো ও সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠার মূল রহস্যটা বহুদলীয় চিন্তার মাঝেই। তলাবিহীন ঝুড়ি বদনাম পাওয়া দেশটির মানুষকে সবুজ বিপ্লবে এনেছেন বহুমত ও বহুদলকে শামিল করার মাধ্যমে। দেশের বর্তমান একদলীয় মানসিকতার দুষ্টে তৈরি ক্রান্তিকাল উৎরাতে জিয়ার মতো নেতা বড় জরুরি। একজন জিয়াই দেখিয়েছেন কীভাবে মতের সঙ্গে মত ও দল মিলিয়ে দেশ গঠনে সবাইকে একমুখী করা যায়। বিএনপির বর্তমান তরুণ শক্তিকে জানতে ও উপলব্ধি করতে হবে, কেন- কীভাবে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় মন-মননে এদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে আসন গেঁড়েছেন। এই উপলব্ধিই বিএনপিকে শক্তি অর্জনে সাহায্য করবে। মাত্র তিন-সাড়ে তিন বছরে দেশের কৃষি, শিক্ষা, শিল্পসহ সব ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন? কীভাবে বাংলাদেশকে দুর্ভিক্ষের রাষ্ট্র থেকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতার পথপরিক্রমা রচনা করেছিলেন? তিনিই প্রথম বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। বৈদেশিক যোগাযোগ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে রেখেছিলেন ব্যাপক ভূমিকা। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গঠন করেছিলেন সার্ক।
জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া ১৯ দফার পরতে পরতে বহুদল-বহুমতের থিমে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন আর দেশপ্রেম। শত ফুল ফুটতে দেয়ার চিন্তা। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আজ যেখানে চরম প্রতিবন্ধকতা। সবকিছু একদল ও জনাকয়েক ব্যক্তির বৃত্তে আটকে দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে ব্যর্থ ও পারিবারিক রাষ্ট্রে পরিণত করার আর বাকি নেই। সেখান থেকে উদ্ধার পেতে বহুদল-বহুমতের রাজনৈতিক স্বীকৃতির বিকল্প নেই। ওই চেতনা থেকেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐকতান গড়েছেন। প্রতিনিধিত্বও করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা দমন-পীড়নে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের পথে যে ভীতি এবং ক্রোধের সৃষ্টি করেছে তা বহুদল-বহুমতকে তাড়িত করার এক দুষ্ট অভিপ্রায়।
ইতিহাসের ঘটনাবলি পর্যালোচনায় দেখা যায়- পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডির পর একদলীয় বাকশাল নেতা খন্দকার মুশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির শপথ নেন। মুশতাক ছিলেন বাকশালের ৪র্থ সদস্য। আগের মন্ত্রী সভার প্রায় সব সদস্যই তার মন্ত্রী সভায় যোগ দেন। ক্ষমতা নেয়ার পর মুশতাক আহমেদ সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন। সে সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এমপি ও তৎকালীন জেনারেল শফিউল্লাহ। জিয়াউর রহমান তখন ছিলেন সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। মুশতাকের মন্ত্রী সভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিজয়ীর বেশে উপস্থিত ছিলেন তাহের-ইনু বাহিনী ও তৎকালীন মুজিব বিদ্রোহী নেতারা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আরও দশ দিন অর্থাৎ ২৪শে আগস্ট পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ। বিদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে সরকারি চাকরি কনফার্ম হওয়ার পরেই তিনি দায়িত্ব ছাড়েন। এরপর যথারীতি সেনাবাহিনীর নিয়মানুসারে ‘ডেপুটি চিফ অব স্টাফ’ থেকে প্রমোশন পেয়ে ২৫শে আগস্ট ‘সেনাপ্রধান’ হন জিয়াউর রহমান। তবে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হলেও তখন তিন বাহিনীর প্রধানের ওপর নজিরবিহীনভাবে ‘ডেপুটি চিফ অব ডিফেন্স’ নামে এক পদ সৃষ্টি করেছিলেন খন্দকার মুশতাক। সে পদে নিয়োগ দেয়া হয় তৎকালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে। প্রায় একই সময়ে জেনারেল ওসমানীকে নিয়োগ দেয়া হয় রাষ্ট্রপতি খন্দকার মুশতাকের ‘ডিফেন্স অ্যাডভাইজার’ পদে।
তখনকার নানা ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার বাঁকে একটা চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমানকে সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হতে হয়েছিল। যদিও তার নেতেৃত্বের স্ফুরণটা ঘটেছিল ১৯৭১ সালেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে। তার উত্থান ছিল নাটকীয়তায় ভরা। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারের পরমুহূর্তে মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক আত্মপ্রকাশ। মেজর জিয়াই শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে শেখ মুজিবকে ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র টেকসই করে সম্প্রসারণ করেছেন। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের নজিরবিহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার পরেও গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ভিন্ন মত ও পথের পরিবর্তে একদলীয় শাসনে দেশ হয়ে যায় ক্ষতবিক্ষত। ঘটে ট্র্যাজেডির পর ট্র্যাজেডি। অবিরাম নানা দুর্ঘটনা-অপঘটনার পর দৃশ্যপটে জিয়ার আগমন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা। জননির্ভর রাজনীতির চিন্তায় সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত না করে তিনি গণরাজনীতিকে উদ্ধার করেন ১৯৭৫-পূর্ব সময়ে পতিত পঙ্কিল আবর্ত থেকে। একই সঙ্গে তিনি নিজেও বেরিয়ে আসেন সেনা প্রভাব থেকে এবং রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ব্যক্তির কাছে। জিয়াউর রহমানের আগে ব্যক্তি আসত রাজনীতির কাছে। কিন্তু তিনি রাজনীতিকে নিয়ে যান ব্যক্তির কাছে। যেটা রাজনীতিবিদ ও সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়েছে।
তার হাতে জন্ম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির ধারক ও বাহক এ দলের মাধ্যমে উন্মেষ ঘটে অগ্রগতি, অভিযাত্রা ও আধুনিকায়নে সমৃদ্ধ এক নতুন বাংলাদেশের। জিয়া ছুটে যান দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো খাল খননে হাতে কোদাল তুলে নেন। কখনো জাল হাতে নদীতে নেমে পড়েন। কখনো মাঠে ফসল আবাদ করেন। আবার কখনো বা কোমলমতি শিশুদের সঙ্গে বই হাতে বসে পড়েন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এই সিপাহশালার হয়ে ওঠেন জাতির কান্ডারি তথা বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। পরিপাটি বাংলাদেশ গড়ার পুরোধা। আজকের পরিভাষায় স্মার্ট বাংলাদেশ। এক আশাবিহীন দরিদ্র ও বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে তিনি বাংলাদেশকে সমস্যা মোকাবিলার উপযোগী করে তুলেছিলেন বহুদলীয় চিন্তায়। সেই বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্র আজ ফেরারি, মরীচিকা। যার পুনরুদ্ধার ছাড়া স্বনির্ভর, মর্যাদা তথা স্মার্ট বাংলাদেশ অসম্ভব। পরিণামে অপরাজনীতির জয়জয়কারই নিশ্চিত। আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসন হয়ে উঠবে অবধারিত। সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনসহ গণতন্ত্রের সূচকগুলো হয়ে যাবে কেবলই ইতিহাস। এমন সন্ধিক্ষণে কেবল বিএনপি নয়, গণতন্ত্রকামী সকলেরই পাঠ-পঠনের বিষয় হতে পারে জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট। যে বহুদলীয় রাজনীতি পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার সত্যিকারের পরিচয় এবং তার আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি দিয়েছিল তা পুনরুদ্ধার মোটেই কোনো একক দল বা ব্যক্তির দায়িত্ব নয়।
লেখক : চিকিৎসক ও পরিচালক, নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট।





