রাজনীতির মাঠে করোনার প্রভাব

সংগৃহীত ছবি

রাজনীতি

রাজনীতির মাঠে করোনার প্রভাব

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ১১ মার্চ, ২০২০

দেশে মাত্র তিনজন করোনা ভাইরাসে (কভিড-১৯) আক্রান্ত হলেও রোগটির প্রভাব পড়েছে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে রাজনীতিসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে। ভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করে রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। একের পর এক সংকুচিত ও বাতিল করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় এবং সরকারি বিভিন্ন আয়োজন। করোনার সংক্রমণ ঠেকানোর আগাম সতর্কতা হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠান পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ৩০ মার্চ অনুষ্ঠেয় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ জাপান সফরসহ মন্ত্রিসভার কয়েক সদস্যের বিদেশি সম্মেলনে অংশ নিতে বিদেশ যাওয়ার কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোও স্থগিত করছে বিভিন্ন কর্মসূচি। কোনো দলই জনসমাগমের মতো কর্মসূচির কথা আপাতত ভাবছে না। চলমান পরিস্থিতিতে গতকাল পূর্বঘোষিত সব কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। কয়েকটি সাংগঠনিক জেলায় তৃণমূলের সম্মেলনের জন্য আওয়ামী লীগের কর্মসূচিও আপাতত স্থগিত। খুব দরকার না হলে দলীয় কার্যালয় বা নেতাদের বাসায়ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজন না করার বিষয়ে ভাবছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম রাজনৈতিক দলের নেতারা। এমন পরিস্থিতিতেও করোনা নিয়ে কাদা-ছোড়াছুড়ির রাজনীতি শুরু হয়েছে। মাত্র তিনজন আক্রান্ত হলেও ‘করোনা প্রতিরোধে সরকার ব্যর্থ’ বলে দাবি করছে বিএনপি। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, করোনা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর সঙ্গে এ নিয়ে ইস্যু খুঁজছে বিএনপি।

৮ মার্চ দেশে যে তিনজন করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন, তারা ছাড়া নতুন করে আর কেউ আক্রান্ত হননি বলে গতকাল রাত আটটার দিকে বাংলাদেশের খবরকে জানান সরকারের ‘রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তবু চারপাশে অজানা আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। গত দুই দিনে নতুন করে দেশে করোনায় কেউ আক্রান্ত  হিসেবে শনাক্ত না হলেও একের পর এক দেশে নতুন করে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া থেমে নেই। করোনা ছড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকেও বলা হচ্ছে ‘উচ্চ-ঝুঁকির দেশ’। বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে স্বভাবতই আতঙ্ক আর উদ্বেগ ভর করেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও। অনেকের মধ্যে কাজ করছে সন্দেহ। জনবহুল রাজধানী ঢাকা অনেকটা থমকে গেছে। বাসিন্দাদের জনকোলাহল এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। করোনার প্রভাব পড়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে ভিড় এড়িয়ে চলছেন নেতাকর্মীরা। প্রভাব পড়েছে ভোটের মাঠেও। দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিও গুটিয়ে আসছে।

ঢাকা-১০ সংসদীয় আসনের আসন্ন উপনির্বাচনের প্রচারণায় জনসমাগম ও ভিড় এড়িয়ে চলছেন নেতাকর্মীরা। প্রার্থীরা নেতাকর্মীদের দলবল নিয়ে ভোটারদের ঘরে ঘরে যাওয়ার বদলে মুঠেফোনে খুদে বার্তা পাঠানো, অনলাইন ও টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা এ মুহূর্তে বেশি করছেন। গতকালও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা ওই সংসদীয় আসনের কোনো এলাকায় জনসমাবেশের আয়োজন করেননি। শূন্য হওয়া বগুড়া-১, যশোর-৬, গাইবান্ধা-৩ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে এলেও সেসব এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে জনসমাবেশের আয়োজন করছে না কোনো দলই। সব দলের নেতাকর্মীরা ভিড় এড়িয়ে চলছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) আসন্ন নির্বাচন ঘিরেও গত দুই দিন নেই আগের মতো নেতাকর্মীদের ভিড়ের প্রচারণা। চার থেকে পাঁচ দিন আগেও সেখানকার চিত্র ছিল ভিন্ন রকম।

বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়ানো করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে মুজিববর্ষের আয়োজনে। সেই সুবাদে ১৭ মার্চ ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের আড়ম্বরপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হচ্ছে না। এর বাইরে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানরাও উদ্বোধনী দিনে থাকছেন না। অন্য বিদেশি অতিথিরা আসছেন না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ঢাকা সফর বাতিল করেছেন। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রাজা পাকসে অপারগতা জানিয়েছেন। নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা ভাণ্ডারীর সফরও বাতিল হয়েছে। ঢাকাস্থ বিদেশি মিশন ও দূতাবাসগুলোকে অনুষ্ঠান স্থগিতের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে।

করোনার ঝুঁকি মোকাবেলায় জনসমাগম এড়াতে এ অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ১৭ মার্চ টেলিভিশন, ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক সম্প্রচার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের কর্মসূচি থাকছে। একই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। প্রাণঘাতী করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার জাপান সফর স্থগিত করা হয়েছে। দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে ৩০ মার্চ জাপানে যাওয়ার কথা ছিল সরকার প্রধানের। জাপানেও করোনা ভাইরাস বেশ ছড়িয়েছে, তাই সফর স্থগিত করা হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে দলটির সারা দেশের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন করার নির্দেশ ছিল। তবে ৪৪টি জেলায় সময়স্বল্পতাসহ কিছু কারণে তখন সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। এসব জেলায় চলতি মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে সম্মেলন করার টার্গেট ছিল ক্ষমতাসীন দলের। এ লক্ষ্যে কার্যক্রমও চলছিল। মার্চ মাসের শুরুতেই একাধিক জেলায় সম্মেলনের আয়োজনও হয়। এর আগে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে সাংগঠনিক সফর শেষ করেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ নেতারা। করোনার প্রভাবে এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সাংগঠনিক জেলায় সম্মেলন সম্ভব হবে কি না, এমন প্রশ্ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।

করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্তের পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পূর্বঘোষিত ১১ মার্চের বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাকার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিযোগ, ‘করোনার ব্যাপারে জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যমসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের যে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা নেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের ব্যর্থতা জনগণ কখনো ক্ষমা করবে না। দেশে যে কয়টি হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর মান ও আক্রান্তদের সুচিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার জরুরি দায়িত্ব সরকার পালন করতে পারেনি। ফলে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়লে নিশ্চিতই দেশবাসী গণহারে অকালমৃত্যুর শিকার হতে পারেন।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘করোনা ভাইরাস নিয়ে রাজনীতি করার কিছু নেই। এই ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। করোনা ভাইরাসকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যে মজুতদারির পাঁয়তারা শুরু করেছে, তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযান শুরু হয়েছে। মানবতা ও জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে মুজিবশতবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।’ ‘বিএনপি করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এবং রাজনীতি করছে’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads