রাশিয়ার ইউক্রেনে অভিযান শুরুর পর প্রথমবারের মতো দেশ দুটির লড়াই থামাতে মধ্যস্থতা করার ইঙ্গিত দিয়েছে বেইজিং। গতকাল সোমবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, শান্তি আলোচনার জন্য গঠনমূলক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে চীন। এদিকে, রাশিয়ার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ চারটি শহরে অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘাত গড়িয়েছে ১২ দিনে। রাশিয়ার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ চারটি শহরে অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে। এখনো নানা দিকে মোড় নিচ্ছে চলমান যুদ্ধ। গতকাল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউক্রেনে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি খবর পাওয়া গেছে। রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যম ইন্টারফেক্স জানায়, দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মস্কোর সময় সোমবার সকাল ১০টা থেকে ওই ঘোষণা কার্যকর করার কথা বলা হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশের পর স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোরে স্থল, আকাশ ও জলপথে ইউক্রেনে হামলা শুরু করেন রাশিয়ার সেনারা। উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে, এমনকি বেলারুশ থেকেও হামলা চালানো শুরু হয়। ধীরে ধীরে রাজধানী কিয়েভের দিকে অগ্রসর হয় রুশ সেনারা। ইউক্রেনের সেনাদের সঙ্গে শুরু হয় তীব্র লড়াই।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, সমস্যা সমাধানে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া, চীনের রেড ক্রস ইউক্রেনে মানবিক সহায়তা দেবে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীনের সঙ্গে রাশিয়ার বন্ধুত্ব ‘পাথরের মতো শক্ত’। তিনি উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার পরিধি আরো বিস্তৃত। এর আগে শনিবার (৫ মার্চ) চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে বলেন, ‘আগুনে ঘি ঢালবে’ এমন যেকোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে বেইজিং।
ইউক্রেনে যা ঘটছে : ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘাত গড়িয়েছে ১২ দিনে। এখনো নানা দিকে মোড় নিচ্ছে চলমান যুদ্ধ। গতকাল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউক্রেনে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি খবর পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ চারটি শহরে অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে। গতকাল দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফে জানানো হয়েছে এই চারটি শহরে মানবিক করিডোর চালু করার। মস্কোর সময় সকাল ১০টা থেকে ঘোষণা কার্যকর করার কথা জানায় তারা। এর আগেও ইউক্রেনের দুটি শহরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে মানবিক করিডোর চালু করেছিল রাশিয়া। কিন্তু তা সত্ত্বেও কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আবারো হামলার অভিযোগ করে ইউক্রেন। যদিও মানবিক করিডোর চালু করে লোকজন সরিয়ে নিতে ব্যর্থ প্রচেষ্টার জন্য দুই দেশই একে অপরকে দোষারোপ করছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, গত ৬ মার্চ দেশটির ইরপিনে রাশিয়া বেসামরিক লোকদের হত্যা করেছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, পূর্বাঞ্চলের চুহুইভ শহর রুশ বাহিনীর কাছ থেকে পুনরায় দখলে নিয়েছেন তারা। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর মাইকোলাইভে নতুন করে রাশিয়ার গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেন সরকারকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আরো ১০ কোটি ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য। রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কার্যালয় থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স রাশিয়ায় তাদের কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকও রাশিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিং ও নতুন কনটেন্ট আপলোড স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।
‘ইউক্রেনে ৬০০ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া’ : ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা গড়ালো ১২ দিনে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সরকারের আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ইউক্রেনে ছয়শ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। ওই কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রাশিয়ার যে সক্ষমতা রয়েছে, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই ইউক্রেনে জড়ো করতে পেরেছে তারা।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা বলেন, খারসন ও মিকোলাইভ শহরে চলমান সংঘাত পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দেখা গেছে রুশ বাহিনী এখনো কিয়েভ, খারকিভ, চেরনিহিভ ও মারিউপোল ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। তবে ইউক্রেনের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলায় আক্রমণের গতি কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কিয়েভ অভিমুখে থাকা প্রায় ৪০ মাইল দীর্ঘ রুশ সামরিক বহরটি স্থবির হয়ে রয়েছে। এ বহরটি কিয়েভ থেকে ঠিক কতটা দূরে রয়েছে, সে ব্যাপারে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিয়েভের প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬ মাইল দূরে এর অবস্থান ছিল বলে এর আগে জানা যায়।
ওই মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আরো বলেন, আমাদের ধারণা, বেশির ভাগ এলাকায় ইউক্রেনীয় নাগরিকরা এখনো যোগাযোগ সুবিধা পাচ্ছে। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার ও সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখতে পারছে।
তবে কিয়েভে বিক্ষোভকারীদের ওপর রুশ বাহিনীর গুলি চালানোর খবর এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর নিশ্চিত করতে পারেননি ওই কর্মকর্তা।
রাশিয়ার করিডোর প্রস্তাব ‘সম্পূর্ণ অনৈতিক’ বলছে ইউক্রেন- মানবিক করিডোর চালু করে রাশিয়া বা বেলারুশ সীমান্তে বেসামরিক লোকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব ‘সম্পূর্ণ অনৈতিক’ বলে দাবি করেছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইউক্রেনের নাগরিকদের নিজ ভূখণ্ড দিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই মুখপাত্র এক লিখিত বার্তায় বলেন, এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক গল্প। কাঙ্ক্ষিত ছবি পেতে জনগণের আবেগ আর কষ্টকে কাজে লাগানো হয়।
ইউক্রেনে হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ পর চারটি শহরে সাময়িক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে রাশিয়া। একই সঙ্গে এসব শহরে মানবিক করিডোর চালু করারও ঘোষণা দেওয়া হয়। এই চারটি শহর হলো রাজধানী কিয়েভ, খারকিভ, মারিউপোল ও সুমি।
এদিকে, নো-ফ্লাই জোন মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দাবি সিনেটর রুবিওয়ের, ইউক্রেনে রুশ হামলার মুখে দেশটিতে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার ধারণা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিবিদদের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। এই আলোচনায় ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণার বিপদের দিকটিও উঠে এসেছে।
‘নোফ্লাই জোন’ ঘোষণার যে আহ্বান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি বারবার জানিয়ে আসছেন, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর মার্কো রুবিওর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এসেছে।
মার্কো রুবিও গতকাল রোববার সিএনএনকে বলেছেন, ‘নো-ফ্লাই জোন মানে কী, তা লোকজনকে বুঝতে হবে। এটা এমন কিছু নিয়ম নয়, যেটা আপনি পাস করেন, আর যেটা সবাইকে মেনে চলতে হবে। এটা রাশিয়া ফেডারেশনের বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার ইচ্ছা।
মার্কিন সিনেটের ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্কো রুবিও বলেন, নো-ফ্লাই জোন মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া।
অপর দিকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস্টোফার মারফি ফক্স নিউজকে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে ইউক্রেনে নো-ফ্লাই জোন কার্যকর করাটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের স্বার্থের জন্য সহায়ক নয়।
ক্রিস্টোফার মারফি বলেন, নো-ফ্লাই জোন করা হলে বিশ্বের দুটি বৃহত্তম ও সবচেয়ে সুসজ্জিত পারমাণবিক পরাশক্তির দেশকে একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যেতে হতে পারে।
তবে অপর ডেমোক্র্যাট সিনেটর জো মানচিন এনবিসিকে বলেছেন, তিনি নো-ফ্লাই জোনের ধারণাটিকে নাকচ করবেন না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রুশ হামলা থেকে সুরক্ষা পেতে তার দেশের আকাশে নো-ফ্লাই জোন চালু করতে পশ্চিমা দেশের প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে তার এই আহ্বানে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ সাড়া দেয়নি। জেলেনস্কির আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো।
নো-ফ্লাই জোন প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত শনিবার তিনি বলেছেন, যদি কোনো দেশ ইউক্রেনের আকাশে নো-ফ্লাই জোন চালু করে, তাহলে সেই দেশও এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বলে ধরে নেবে মস্কো।
রুশ প্রেসিডেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, নো-ফ্লাই জোন শুধু ইউরোপ নয়, পুরো বিশ্বের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এছাড়া, ইন্টারপোল থেকে রাশিয়াকে বাদ দিতে চায় পশ্চিমা বিশ্ব- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ইন্টারপোল থেকে রাশিয়াকে বাদ দিতে আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল এসব কথা বলেন। খবর এএফপির।
স্থানীয় সময় গতকাল রোববার এক টুইটে প্রীতি প্যাটেল বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইন্টারপোল থেকে অবিলম্বে রাশিয়াকে প্রত্যাহার করতে অনুরোধ জানিয়েছে। এ সপ্তাহেই রাশিয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইন্টারপোলের নির্বাহী কমিটির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল আরো বলেন, আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাশিয়ার আচরণ সরাসরি হুমকি। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর এ ধরনের অনুরোধের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি প্যাটেল। তিনি বলেন, ইউক্রেনে হামলাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে চায়।
গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধ চালানোর বিষয়ে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে। বিশেষ করে, বেসামরিক মানুষের ওপর রাশিয়ার হামলা চালানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
ইউক্রেন হামলায় মস্কোর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ নিয়ে তদন্তের জন্য গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্যরা ভোট দেন। ইন্টারপোলের সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯৪।





