রাশেদা আক্তার
রিয়া আরবি শব্দ। অর্থ ইবাদতে লোক দেখানো ভাব। অর্থাৎ নিজেকে সৎ ও ইবাদতকারী ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ করার জন্য এবং অন্যের ভক্তি ও শ্রদ্ধা আকর্ষণের উদ্দেশ্যে ইবাদত করাকে ‘রিয়া’ বলে। মানুষের কাছে নিজের সৎ আমলকে অর্থাৎ ইবাদতকে যে কোনো প্রকারে কথায়, কাজে, আচরণে অন্যের কাছে প্রকাশ করার ইচ্ছা পোষণ করাই রিয়া। রিয়া অতি সঙ্গগোপনে মানুষের অন্তরে বাসা বাঁধে। তখন মানুষ নিজেও উপলব্ধি করতে পারে না যে, সে রিয়ায় লিপ্ত হয়েছে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআন শরীফের সুরা মাউনে রিয়াকারী নামাজিদের জন্য ধ্বংস রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। এমনিভাবে কোরআন তেলাওয়াত, রোজা, জেহাদ, হজ্ব, জাকাত, দান-সাদকা ও মানুষকে খাবার খাওয়ানো ইত্যাদি। ইবাদতের মাধ্যমেও রিয়া হতে পারে যদি মানুষের মধ্যে প্রচার ও প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা অন্তরে বিদ্যমান থাকে। রিয়ার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। রিয়ার কারণে মানুষের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়। মহাবিচার দিবসে আল্লাহর কাছে তার কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না; বরং রিয়ার কারণে গুনাহ হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা:) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহতায়ালা তাদের প্রত্যেককে বলবেন তুমি মিথ্যাবাদী! তুমি আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করনি বরং এই জন্য করেছ যে যাতে মানুষ তোমাকে বীর বলে। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে দান-খয়রাত করনি বরং দাতা বলে প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য করেছ।’ এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘তারা সাওয়াব পায়নি এবং রিয়া তাদের সকল কর্ম বরবাদ করে দিয়েছ।’ অন্য এক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা যখন বান্দার ক্রিয়াকর্মের প্রতিদান দেবেন, তখন বলবেন, তোমরা দুনিয়াতে যাদেরকে দেখানোর জন্য আমল করতে তাদের কাছে যাও এবং দেখো তাদের কাছে কোনো প্রতিদান পাও কি না!’ যেসব ইবাদত সাওয়াব পাওয়ার আশায় করা হয় আবার অন্যের তথা মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ারও প্রত্যাশা থাকে সেসব ইবাদত হলো রিয়ামিশ্রিত ইবাদত। তাই ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা যতটুকু থাকে ততটুকুর সাওয়াব পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে অন্যের বা মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা বা সম্মানের যতটুকু আশা থাকে ততটুকুর জন্য আল্লাহর আজাব বা কষ্ট ভোগ করতে হবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ অন্তরের খবর জানেন’ অর্থাৎ কার নিয়ত কোন ধরনের আল্লাহই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেছেন, ‘যাবতীয় কাজের ফলাফল নিয়তের ওপরই নির্ভর করে এবং প্রতিটি লোক তাই পাবে যা মানুষ নিয়ত করেছে।’ রিয়া অতি সঙ্গগোপনে প্রবৃত্তিকে প্ররোচিত করে থাকে। এই প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত কঠিন। আর রিয়ার ক্ষতিকর অবস্থা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া জরুরি।
মহান আল্লাহ গোপন ইবাদত ও প্রকাশ্য ইবাদত উভয়ের প্রশংসা করে বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্য দান-খয়রাত কর তবে তো খুব ভালো কথা আর যদি গোপনে দান খয়রাত কর তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম।’ তাই প্রকাশ্য আমলের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। প্রথমত, যেখানে অপরের অনুসরণ নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, অন্তরের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে যেন শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় এবং রিয়া যেন সেখানে অনুপ্রবেশ না করে। প্রকাশ্য ইবাদত সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সৎকর্মের প্রচলন করে তারপর মানুষ তা করে সে সেই সৎকর্মের সাওয়াব এবং যারা এর অনুসরণ করে তাদের সাওয়াব পাবে।’ প্রকাশ্য আমলের একমাত্র ভয় হচ্ছে রিয়া। তাই গোপনে আমল করার মধ্যেই নিরাপত্তা নিহিত। কিছু ইবাদত আছে যা ইচ্ছা করলে গোপনে করা যায়। যেমন-নফল নামাজ, রোজা, দান-খয়রাত, আল্লাহর জিকির ও কোরআন-হাদিস সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন ইত্যাদি। এসব কাজের বিনিময়ে আল্লাহর কাছে রয়েছে উত্তম প্রতিদান। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন নেক আমল ব্যতীত অন্য কোনো কিছুরই বিনিময় হবে না।’ আবার রিয়ার ভয়ে সৎকর্ম বর্জন করা এক ধরনের ভ্রান্তি এবং এটা শয়তানের প্ররোচনায় হতে পারে। সুতরাং আমাদের ইবাদত তখনই মহাসাফল্য অর্জন করা যাবে যদি তা এখলাস (নিয়তের বিশুদ্ধতা) সহকারে সম্পন্ন করা যায়। আল্লাহ আমাদের রিয়ামুক্ত ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমীন!
লেখিকা : শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়





