দেশের পূর্বাঞ্চল রেলপথে ট্রেন চলাচল করলেও আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে আসন বিহীন টিকিট বন্ধ রেখেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু থেমে নেই আসনবিহীন টিকিটে যাত্রী ভ্রমন। নিত্যদিন আসনবিহীন টিকিট বা বিনা টিকিটে আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে অনেক যাত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করছে। ট্রেনের কিছু অসাধু গার্ড, অ্যাটেন্ডেন্ট, দায়িত্বরত রেলওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা অবৈধভাবে বিনা টিকিটে যাত্রী ভ্রমনে জড়িত রয়েছে বলে এমন অভিযোগ যাত্রীদের।
তারা আসনবিহীন যাত্রীদের খাবার গাড়ি , বগির ইবাদতখানায় বসিয়ে এবং দরজার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে অবৈধভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। করোনার কারণে ট্রেন বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হওয়ার পর থেকে রেলওয়ের কিছু অসাধু অ্যাটেন্ডেন্টসহ সংশ্লিষ্টরা এ কাজ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশ্য রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন টিকিট বিহীন কোন যাত্রী ট্রেনে ভ্রমন করার কোন সুযোগ নেই। ট্রেনে দায়িত্বরতা বিনা টিকিটে যাতে কোন যাত্রী ট্রেনে ভ্রমন না করতে পারে সেক্ষেত্রে তারা খুবই তৎপর রয়েছে। তারা টিকিট বিহীন ট্রেনে ভ্রমন করা যাত্রীদের কাছ থেকে গন্তব্যের ভাড়া আদায় করছে ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে যাত্রা বিরতি দিয়ে প্রতিদিন আন্ত:নগর মহানগর গোধুলী, প্রভাতি, তৃর্ণা নিশিতা পাহাড়িকা,উদয়ন, উপকুল এক্সপ্রেস, বিজয় এক্সপ্রেস চলাচল করছে। তাছাড়া আখাউড়ার আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে
পারাবত, জয়েন্তীকা, উপবন,কালনী এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। ওইসব ট্রেন দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করছে। তবে ঢাকা-চট্রগ্রাম, সিলেট ও নোয়াখালী রেলপথে ওই সব ট্রেনে আসন বিহীন টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই সুযোগে ট্রেনের কিছু অসাধু গার্ড,অ্যাটেন্ডেন্ট, দায়িত্বরত রেলওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা অবৈধভাবে আসনবিহীন যাত্রীদেরকে ট্রেনে তুলে হাতিয়ে নিচ্ছেন তাদের কাছ থেকে টাকা । যাত্রীরা ও সহজ পহ্নায় গন্তব্য স্থলে যেতে তাদেকে ম্যানেজ করে নিরাপদে ট্রেনে ভ্রমন করছেন।
সরেজমিনে আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্ত:নগর উপকুল এক্সপ্রেস ট্রেনটি আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনে যাত্রা বিরতি করছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়ত করতে অনেক যাত্রী ট্রেনে উঠছেন। এরমধ্যে টিকিট বিহীন অনেক যাত্রীকে ট্রেনের দায়িত্বরত অ্যাটেন্ডেন্টদের সাথে কথা বলতে দেখা যায়। তারা নিরাপদে গন্তব্যে যেতে করছে দরদাম। নিরুপায় হয়ে ওইসব যাত্রীরা অ্যাটেন্ডেন্টের হাতে তুলে দেন দাবি করা অর্থ। এরপর তাদের বিনা টিকিটের যাত্রীদের খাবার গাড়ির আসনে ও ইবাদতখানায় বসিয়ে দেয়া হচ্ছে।
এদিকে ট্রেনটির মাঝখানে রয়েছে খাবারের গাড়ি। এরপর রয়েছে ইবাদাতখানার জায়গা। খাবার গাড়িতে প্রবেশ করেই চোখে পড়ে অবৈধ যাত্রী। প্রতিটি আসনে বসে আছে তারা। তাদের পাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছেন অ্যাটেন্ডেন্ট। তারা অভয় দিচ্ছেন, টিকিট না থাকলেও কোনো সমস্যা নেই।
নির্বিকার বসে আছেন বিনা টিকিটের যাত্রীরা। টিকিট কেটেছেন কিনা- জানতে চাইলে এক যাত্রী মুহূর্তেই মুখ ফিরিয়ে নেন।
এভাবে সবচেয়ে বেশি যাত্রী চলাচল করে থাকেন উপকুল, মহানগর, পারাবত, জয়েন্তিকা পাহাড়িকা ও উদয়ন ট্রেনে। ট্রেন যাত্রীদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া যায়। তবে ইবাদতখানা কিংবা খাবার গাড়িতে বসার আগেই টাকা বুঝিয়ে দিতে হয় অবৈধ যাত্রীদের। অন্যথায় আসনে বসতে দেয়া হয় না তাদেরকে।
একটি সূত্রে জানা গেছে আখাউড়া কিংবা আজমপুর রেলওয়ে স্টেশনে রেলওয়ের দায়িত্বরত কিছু লোক দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রীরা ট্রেনের টিকিটের জন্য আসলে তারা কৌশল করে ট্রেনে তুলে দিচ্ছেন।
আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে কথা হয় পৌর শহরের রাধানগর এলাকার রঞ্জিত দাসের সাথে। তিনি বলেন স্ত্রীর ডাক্তার দেখানোর জন্য অনেক চেষ্টা করে ঢাকা যেতে আসনযুক্ত কোন টিকিট পায়নি তিনি। এক পর্যায়ে আন্ত:নগর উপকুল এক্সপ্রেস ট্রেনের দায়িত্বরত মপল অ্যাটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলে তিনি ট্রেনে উঠেন । এ জন্য তাকে দিতে হয় জনপ্রতি ১৭০টাকা। তিনি আর ও বলেন আসার সময় আসনযুক্ত টিকিট না পেলে এভাবে আসা ছাড়া আর কোন পথ নেই। এ স্টেশনের বেশীভাগ টিকিট কালোবাজারীদের হাতে চলে যাওয়ায় সময়মতো টিকিট পাওয়া যায় না। ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আসা যাত্রী মো. ফোরকান উদ্দিন বলেন, কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে অ্যাটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলে খাবারের বগিতে করে আসতে হয়েছে। এজন্য ১শ টাকা দিতে হয়।
হীরাপুর এলাকা থেকে প্রবাসী মো. আব্দুর রহমান ও সানী বলেন, তারা টিকা দেওয়ার জন্য ঢাকায় যাচ্ছেন। কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। কি ভাবে ঢাকা যাবে এ নিয়ে চিন্তা করছিল। এক পর্যায়ে অ্যাটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলে তারা ট্রেনে উঠেন। এ জন্য তাদেরকে দিতে হয়েছে প্রায় ৪শ টাকা।
আজমপুর রেলওয়ে স্টেশনে স্কুল শিক্ষক মো. কাউছার মিয়া বলেন, ঢাকায় আত্মীয়’র এক অনুষ্ঠানে যেতে কাউন্টারে টিকিটের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু না পাওয়ায় অনেকটাই তাকে বিপাকে পড়তে হয়। ট্রেন স্টেশনে আসলে অ্যাটেন্ডেন্টের সাথে তারা কথা বলে তিনি ট্রেনে উঠেন। এরপর তাকে খাবারের বগির মধ্যে একটি বালতির মধ্যে বসিয়ে দেন। এ জন্য তাকে দিতে ১৫০ টাকা দিতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অ্যাটেন্ডেন্ট বলেন, কাউন্টারে যেহেতু আসনবিহীন টিকিট দেওয়া হচ্ছে না তাই অনেক যাত্রী নিরুপাই হয়ে ভ্রমন করছেন। ট্রেনের ঝামেলা এড়াতে কেউ কেউ অ্যাটেন্ডেন্টের সাথে যোগাযোগ করলেও অনেক সময় ট্রেনে তুলা হয় অনেক সময় তুলা হয় না। বিনা টিটিকে অনেক যাত্রী নিজ দায়িত্বে ট্রেনে উঠায় এজন্য তাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। ঝামেলা এড়াতে অনেকেই আমাদের সাথে কথা বলে উঠছে।
আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন সুপার মো: কামরুল হাসান তালুকদার বলেন বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমন করার কোন সুযোগ নেই। আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে দায়িত্বরত টিটিইরা খুবই তৎপর রয়েছে। যে সমস্ত যাত্রীরা বিনা টিকিটে ট্রেন উঠছেন তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন। প্রতিদিন বিনা টিকিটে ভ্রমন কারী যাত্রী কর্তৃক আদায়কৃত ভাড়াগুলো টিকিট কাউন্টারে জমা দেওয়া হচ্ছে।





