জাতীয়

রোজার আগেই বেসামাল নিত্যপণ্যের বাজার

  • সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
  • প্রকাশিত ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

রমজান মাস আসতে এখনো বাকি আরো দেড় মাস। কিন্তু সেই রমজানকে সামনে রেখে এখনই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে রাজধানীর বাজার। অস্বাভাবিক হারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোয় শুধু নিম্নবিত্ত নয়, দুর্বিষহ উঠছে মধ্যবিত্তের জীবনও। চাল, ডাল, চিনি, পিঁয়াজ, তেল সবকিছুরই দাম বাড়ছে লাগামহীন গতিতে। ক্রেতাদের শঙ্কা, রমজানের দেড় মাস আগে নিত্যপণ্যের দাম এমন অস্বাভাবিক হলে, রোজার মধ্যে পণ্য কেনায় কঠিন হয়ে পড়বে।  

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখনই তাদের আওয়াজ তুলে সরকারের দৃষ্টি কাড়তে হবে। তা না হলে নিম্ন আর মধ্যবিত্তের আওয়াজ পৌঁছাবে না সরকারের কানে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণেই কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। আর অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন কারসাজি করে দাম বৃদ্ধি না করতে পারে এজন্য জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) মাঠে কাজ করবেন।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের অতিরিক্ত দাম শুনে হতবাক হয়ে পড়েন ক্রেতারা। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারো বেড়েছে সবজি, গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি, সয়াবিন তেল ও পেঁয়াজের দাম। রমজান মাস আরো ঘনিয়ে এলে এই মূল্যবৃদ্ধির হার আরো উর্ধ্বমুখী হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউ।

গত বৃহস্পতিবার সরকারি বিপণন সংস্থার (টিসিবি) প্রতিদিনের প্রকাশিত বাজারদরের তালিকা থেকে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ১৭টি পণ্যের। যার মধ্যে রয়েছে মুরগি, গরুর মাংস, সয়াবিন তেল, পাম তেল, পেঁয়াজ, চিনি, ডিম, জিরা, আটা, ময়দা ইত্যাদি। বিপরীতে কমেছে মাঝারি আকারের চাল, রসুন ও হলুদের দাম।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী কাঁচাবাজার, খিলক্ষেত বাজার, আজিমপুর কাঁচাবাজার ও হজ ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায় সবধরনের মাংসের দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০-২৫০ টাকার নিচে নেই কোনো ভালো মাছ, ১৭০ টাকা কেজি ব্রয়লার মুরগি, ৬৫০ টাকা কেজি গরুর মাংস, ১০০০ টাকা কেজি খাসির মাংস, ভরা মৌসুম থাকলেও চড়া সবজির বাজার। মোটা চালের কেজি ৫২ টাকা, সয়াবিন তেল ১৬৫-১৬৮ টাকা। অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়ন্ত। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা অসহায় নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ। কিছু দাম কমানোর আশায় এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরে ঘুরে হয়রান তারা।

বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়, গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। সোনালি মুরগির কেজি ২৫০-২৮০ টাকা। দেশি মুরগি ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকায়। কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে গরুর মাংসের দাম। প্রতি কেজি গরুর মাংশ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬২০ টাকায়, গত সপ্তাহে ছিল ৫৮০ থেকে ৬২০ টাকা।

গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে মাছ বাজারও কিছুটা চড়া। মহাখালী কাঁচাবাজারে শাহ আলম নামে এক মাছ বিক্রেতা বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত মাছের সরবরাহ থাকার পরও খাবারের দাম ও জ্বালানি খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। শুধুমাত্র হোটেলগুলোতেই বড় মাছ বিক্রি হচ্ছে। খুব কম সংখ্যক সাধারণ মানুষই বড় মাছ কিনছে। অতিরিক্ত দাম নিয়ে আমাদেরও কিছু বলার নেই।

এদিকে হুট করেই রাজধানীর বাজারগুলোতে অস্বাভাবিক বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। এক লাফে পেঁয়াজের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করছেন ৫০-৬০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে এই পেঁয়াজের কেজি ছিল ৩০-৩৫ টাকা।

পেঁয়াজের দাম বাড়ার বিষয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী গৌতম বলেন, বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এ কারণে এখন পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এছাড়া অন্য কোনো কারণ নেই।

দাম বেড়েছে মোটা চালের। প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, গত সপ্তাহে ছিল ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা। অন্যদিকে দাম কমেছে মাঝারি মানের চালের। কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৬ টাকা। দাম বেড়েছে তেলের। সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিনের লিটারে আট টাকা বাড়িয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকায়, গত সপ্তাহে ছিল ১৪৬ থেকে ১৫৩ টাকা, বোতলজাত বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৮ টাকা, গত সপ্তাহে বিক্রি ছিল ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকা।

রমজানে চিনির চাহিদা থাকে তুঙ্গে। কয়েক মাস স্থির থাকার পর আবার নড়েচড়ে উঠেছে চিনির বাজার। এছাড়াও চার থেকে পাঁচ মাস ধরে মসুর ডালের দাম বেড়েই চলেছে।

শীতের সবজির ভালো ফলন থাকলেও পুরো মৌসুমজুড়েই ছিল সবজির চড়া দাম। দুই-একটি ছাড়া বেশিরভাগ সবজির কেজি ৪০ টাকার ওপরে। কোনোটির দাম ১০০ টাকাও ছুঁয়েছে। টমেটো ৪০ টাকা, গোল বেগুন ৮০ টাকা, লম্বা বেগুন ৭০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, শিম ৫০-৬০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৫০ টাকা, শসা ৩৫ টাকা, গাজর ৩০ টাকা, ফুলকপি ৪০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০, কাঁচামরিচ ৬০ টাকা, রসুন ১১০-১২০ টাকা, গোল আলু ২০ টাকা, দেশি আদা ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও লাউ ৯০-১০০ টাকা, ব্রুকলি, ফুলকপি, পাতা কপি ৪০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে।

কাঁচাবাজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। ক্রেতারা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ায় সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

শামসুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ছে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা হিমশিম খাচ্ছি। সবকিছুর দাম এভাবে বাড়তে থাকলে চলার উপায় থাকবে না। কিছুটা কম দামে জিনিস কেনার আশায় নিউমার্কেটে এসেছিলাম। এখানেও দেখি একই অবস্থা। পাইকারি খুচরা সবখানেই প্রায় একই রকম দাম। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, রমজান মাস শুরুর আগেই যদি নিত্যপণ্যের বাজারের এমন অবস্থা হয় তাহলে রমজানে মাসে কি পরিস্থিতি হবে!

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে বাজার করতে আসা মোহাম্মদ আলামিন হোসেন বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের হাসি-কান্না অনেকটাই নির্ভর করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। দাম কম থাকলে পেটভরে দুমুঠো খাওয়া যায়। দাম লাগামছাড়া হলে অনেক সময় না খেয়ে কাটাতে হয়। তিনি বলেন, মাসের শুরুর দিকে হাতে টাকা থাকলেও শেষের দিকে ধার করে চলতে হয়।  যে হারে পণ্যের দাম বাড়ছে, তাতে পরিবার নিয়ে চলা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

মতি হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, চালসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের শ্রমের দাম তো বাড়েনি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সবার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। নাভিশ্বাস উঠেছে স্বল্প আয়ের মানুষের। ভোক্তাদের সোচ্চার হতে হবে। নয়তো সরকার শুনবে না। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কয় দিন পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দাবি তুলবেন তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য। সরকারও হয়তো মেনে নেবে। কিন্তু সরকারি চাকরির বাইরে সাধারণ মানুষের তো আয় বাড়ছে না। কষ্টটা তাদেরই বেশি হবে। সে জন্য নিত্যপণ্যের বাজারে এখনই লাগাম টানতে হবে।

এদিকে তেল, চিনি ও ডালের দাম  আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধির কারণেই বাড়ানো হয়েছে বলে জনিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে মাঠে ডিসিরা কাজ করবেন বলে জানান তিনি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রংপুর সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এসব কথা বলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আমাদের একটি টেরিফর কমিশন ছিল, তারা আন্তর্জাতিক বাজারে যে দাম থাকে সেই দামটাকে  ধরে এভারেজ করে দাম নির্ধারণ করে দেয়। সরকারের কিছুই করার নেই। কমাতে হলে সাবসিটি দিতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, তেল, ডাল আর চিনির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার কারণে দাম বাড়ছে, তবে কখনো কখনো অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেয়,  দাম বাড়িয়ে দেয়, সে জন্য  আমাদের ভোক্তা অধিকার আছে তারা কাজ করে, করছে। তিনি বলেন, যেখানে অবৈধভাবে পণ্যের দাম বাড়বে সেখানে ডিসিরা কাজ করবে, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads