রোহিঙ্গাদের কারণে ধ্বংস হওয়া পরিবেশের ক্ষতির প্রভাব পড়বে ধীরে ধীরে: মত বিশেষজ্ঞদের

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

সারা দেশ

রোহিঙ্গাদের কারণে ধ্বংস হওয়া পরিবেশের ক্ষতির প্রভাব পড়বে ধীরে ধীরে: মত বিশেষজ্ঞদের

  • কক্সবাজার প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ২৩ অগাস্ট, ২০২০

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রভাবে ধ্বংসের মুখে কক্সবাজারের বন ও জীববৈচিত্র। ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়তে শুরু করবে বলে জানান পরিবেশবিদরা।

কক্সবাজার বন বিভাগের তথ্যমতে,কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ছিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, হিমছড়ি ও ইনানী জাতীয় উদ্যানের মতো জীববৈচিত্র্যের এলাকা কিন্তু ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে সাড়ে সরকারি হিসাবে ৮ লাখ রোহিঙ্গা আসার পর দুই হাজার হেক্টর বন ধ্বংস হয়েছে। এই রোহিঙ্গারা আসার আগেও সেখানে অবস্থান করছিলেন মিয়ানমারের এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর আরো ৩ লাখ মানুষ গত দেড় বছরে ছোট-বড় হাজার হাজার গাছ কাটা হয়েছে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প, ফার্নিচার তৈরি এবং রান্নার জ্বালানির জন্য ইতি মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় বনভুমি ধ্বংসের মহারণ হয়েছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ন কবির জানান,২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে বিপুল সংখ্যাক রোহিঙ্গা একসাথে আসার পরে উখিয়া টেকনাফে যে পরিমান পরিবেশ বিপর্যয় হয়েছে তা বিশে^র আর কোথায় হয়েছে কিনা জানা নেই। সেখানে বর্তমানে ৩৩ টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য প্রথমে ৬১৬৪ একর বনভুমি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে আরো বিভিন্ন ভাবে প্রায় ৮ হাজার একর বনভুমি তারা দখল করে বসতী স্থাপন করেছে। এতে অসংখ্য পাহাড় বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার গাছ কাটা পড়েছে,ফলে মারাত্বক পরিবেশ বিপর্যয় হয়েছে। তিনি বলেণ,পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাব এখন বুঝাযাবে না সেটা ধীরে ধীরে বুঝাযাবে। এই বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াও সম্ভব নয় বলে মত দেন তিনি।

সম্প্রতি ‘অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স' সাময়িকীতে এ বিষয়ে সম্প্রতি ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং পরিবেশ' শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছেন শরীফ আহমেদ মুকুলসহ সাতজন পরিবেশ

বিশেষজ্ঞ, তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘‘কুতুপালং ক্যাম্পের বিস্তৃতির কারণে বিশ্বব্যাপী বিপদাপন্ন ‘এশিয়ান এলিফ্যান্টের' একমাত্র করিডরটি বন্ধ হয়ে গেছে ফলে ওই ক্যাম্পের পশ্চিম প্রান্তে আটকা পড়েছে প্রায় ৪৫টি হাতি।এসব কারণে সেখানে মানুষ আর হাতির মধ্যে সংঘাত বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয় ওই নিবন্ধে। এখন পর্যন্ত হাতির হামলায় ১৩ জন মানুষের প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে জ্বালানির কাঠ সংগ্রহের কারণে অবশিষ্ট হাতিগুলো রয়েছে শঙ্কার মধ্যে।

উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান,রোহিঙ্গাদের কারনে ক্ষতির তালিকা অনেক দীর্ঘ তার মধ্যে সব চেয়ে বেশি ক্ষতে হয়েছে আমাদের পরিবেশ,বর্তমানে উখিয়ার পানির স্তর অনেক নীচে নেমে গেছে। গেল শুস্ক মৌসুমে এখানে পানির জন্য অনেক সমস্যা হয়েছে সামনে জানিনা কি হবে। সব চেয়ে বড় কথা কয়েক লাখ গাছ কাটা হয়েছে ফলে অক্সিজেন ভান্ডার শেষ হয়ে গেছে। একই সাথে তাদের ফেলা ময়লা আবর্জনার কারনে পরিবেশ মারাত্বক দূষিত হয়ে পড়েছে। সুজন টেকনাফ উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবিএম আবুল হোসেন রাজু জানান,আজ থেকে ৩ বছর আগেও টেকনাফ নেচার পার্কে জেলা শহর থেকে শুরু করে ঢাকা চট্টগ্রাম থেকে পর্যটক আসতো। সেখানে বানর,হরিন সহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু দেখা যেত আমারও আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে অবসরে সেখানে গিয়ে নির্মল বাতাস নিতাম। কিন্তু এখন সেখানে রোহিঙ্গাদের অত্যাচারে পরিবেশ ভারী হয়ে গেছে। কোন জীবজন্তুতো দূরের কথা সেখানে কিছু ভাষবান মানুষের ঘরবাড়ি ছিল সেগুলোও উঠেযেতে বাধ্য হয়েছে।

এ ব্যপারে বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অবসর প্রাপ্ত সহকারী পরিচালক প্রফেসর আখতার আলম জানান,পরিবেশের ক্ষতি চোখে দেখা যায় না। এটা যখন কোন বিধ্বংসী রপ নিয়ে আসে তখন বোঝা যায়। যেমন ভুমিধ্বস,পাহাড় ধ্বস,পানির স্তুর না থাকা,অক্সিজেনের সংকটে প্রাণীকূল না থাকা,বন্যপ্রাণী মারা যাওয়া ইত্যাদি। রোহিঙ্গার কারণে কক্সবাজারের যে পরিবেশ বিপর্যয় হয়েছে সেটার প্রভাব শুধু কক্সবাজারে থাকবে এই চিন্তা করলে ভুল হবে কারণ এর প্রভাব সারা দেশের উপর পড়বে। ভুমিকম্পের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ কোনো এলাকা নয় বরং একটি দেশের উপর প্রভাব ফেলে। আমার মতে, যেহেতু দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোন সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না তাই রোহিঙ্গাদের ভিন্ন জেলায় বা ভাসানচরে স্থানান্তর করাই ভালো হবে।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পার্থ স্বারথী সৌম বলেন,পরিবেশ বলতে শুধু গাছ পালা,মাটি পাহাড় নয়, এখানে অনেক কিছুর বিষয় আছে। তবে প্রাকৃতিক ক্ষতি দেরিতে দেখা দিলেও আরো কিছু দৃশ্যমান ক্ষতি ইতোমধ্যে দেখা দিচ্ছে যেমন উখিয়া টেকনাফে পানির স্তর নাই,নলকূপে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তার অবস্থা করুন, অতিরিক্ত ঘরবষতির ফলে মানুষের প্রকৃতিগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিতো আছেই সব কিছু কিন্তু পরিবেশের অন্তর্ভূক্ত।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন জেলা সাধারণ সম্পাদক জানান,সরকারি ভাবে প্রায় ৮ হাজার একর বনভুমির ক্ষতির কথা বলা হলেও স্থানীয় তথ্য মতে প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করেছে। এছাড়া এখনো নতুন নতুন ঘরবাড়ি তৈরি করছে। আর ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য পুরু দেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের অপেক্ষা না করে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদার করা না হয় রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads