লোডশেডিংয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ

ফাইল ছবি

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

লোডশেডিংয়ে বাড়ছে দুর্ভোগ

  • রতন বালো
  • প্রকাশিত ২১ জুলাই, ২০২২

আদর্শ কৃষক বরুন মন্ডল। বয়স ৩৫ এর ঊর্ধ্বে। মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে সুলতানপুর গ্রামের তার বাড়ি। মা-বাবা, ভাই, মেয়ে ও ভাতিজিসহ ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে তার সংসার। চলতি মৌসুমে শুরু করেছেন রোপা আমন প্রকল্প। ৩০০ মন ধান উৎপাদনের টার্গেট নিয়ে শ্যালো মেশিন (বিদ্যুতের সাহায্যে) দিয়ে ৫ একর জমিতে রোপ আমন ধানের চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু সরকার গত ১৮ জুলাই থেকে সারা দেশে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু করে। এই লোডশেডিং আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তার রোপা আমন আবাদ বিঘ্ন হচ্ছে। সাধারণ এই কৃষকের ভোগান্তি চরমে। প্রতিদিন গড়ে লোডশেডিং হচ্ছে ৭-৮ ঘণ্টা। শ্যালো মেশিন চালাতে পারছেন না। এদিকে, বৃষ্টি নেই। তীব্র দাবদাহে রোপা আমন ধান শুকিয়ে যাচ্ছে। বিরূপ আবহাওয়ায় লক্ষ্য মাত্রা ধান উৎপাদনের বিঘ্ন সৃষ্টি হবে বলে শঙ্কাও প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের শিডিউল ঢাকায় মানা হলেও অন্য গ্রামাঞ্চলের কোথাও মানা হচ্ছে না। বেশি অভিযোগ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে। সরকারের তরফ থেকে একঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের কথা বলা হলেও কমপক্ষে তিন-চার ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকছে না। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে বিস্তর সমালোচনা। লোডশেডিং এর কারণে তার লক্ষ্যমাত্রা ধান উৎপাদন করতে না পারলে তার সংসার চালানো অসম্ভব হবে বলে মনে করছেন তিনি।

বরুন মন্ডলের মতো নেত্রকোনার বাসিন্দা রহিম সুলতানাও এই অভিযোগ করেন। গত সোমবার রাত ১২টা থেকে দুপুর ৩টা, এই ১৫ ঘণ্টার মধ্যে পাঁচবার আধঘণ্টা থেকে একঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল বুধবার শুনলাম সব জায়গায় এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করা হবে। মফস্বলের জন্য যেমন খুশি তেমন লোডশেডিংয়ের রুটিন করা হয়েছে নাকি!

এদিকে, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার দুই বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসি ও ডেসকো ১৯ জুলাই থেকে সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের তালিকা তৈরি করা শুরু করেছে। সেই অনুযায়ী গতকাল বুধবারের তালিকাও প্রকাশ করেছে তারা। কোম্পানি দুটির ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট লিংকে গিয়ে এই তালিকা দেখতে পারবেন গ্রাহকরা।

তবে বিদ্যুতের অন্য চার বিতরণ কোম্পানির মধ্যে নেসকো আজকের তালিকা প্রকাশ করলেও আজকের তালিকা এখনো দেয়নি। অন্যদিকে পিডিবি, আরইবি ও ওজোপাডিকো এখন পর্যন্ত তাদের ওয়েবসাইটে কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি।
এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিং আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। প্রতিদিন গড়ে লোডশেডিং হচ্ছে ১০ ঘণ্টা। গ্রীষ্মের এ গরমে অস্বস্তি ছাড়াও বিভিন্ন রোগে ভুগছেন সর্বস্তরের মানুষ। অফিস আদালতে কাজ-কর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। সংবাদকর্মীরা জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রেরণে ব্যর্থ হচ্ছে। কখন বিদ্যুৎ আসবে-সর্বস্তরের মানুষ শ্যেণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। কবে নাগাদ লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে নিষ্কৃতি পাবে, এ প্রশ্ন এখন সর্বস্তরের মানুষের।

ফ্রিজে রাখা খাদ্যসামগ্রী পচে যাচ্ছে। মানুষ হিমেল হওয়ার প্রত্যাশায় গাছ-গাছালির নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন। স্থানীয় কম্পিউটার দোকানের পরিচালক জহির রহমান ও শরীফ হোসেন অভিযোগ বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের লাগামহীন লোডশেডিংয়ে সময় মতো প্রশ্নপত্র পর্যন্ত সরবরাহ করা যাচ্ছে না। লোডশেডিংয়ে ফ্রিজে সংরিক্ষত খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রায়পুরে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার। বিদ্যুতের প্রয়োজন প্রায় ২৭ মেগাওয়াট, নোয়াখালী চৌমুহনীর পিডিবির ডগ্রড থেকে পাওয়া যাচ্ছে ৬-৭ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় পৌণে ৪ লাখ জন অধ্যষিত মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। পৌর শহরের কিছু অংশ বিকল্প বিদ্যুৎ হিসেবে ব্যবহার করছে জেনারেটর। এদিকে স্থানীয় পল্লিবিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন যেভাবে আমাদের নির্দেশনা আসে, সেভাবে আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকি। এদিকে স্থানীয় পল্লিবিদ্যুৎ অফিসের এজিএম জানান, পার্শ্ববর্তী থানা রামগঞ্জে পিজিসি কোম্পানির গ্রিড মে মাসে সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই গ্রিডটি সম্পন্ন হলে এ দুরবস্থা থাকবে না।

ময়মনসিংহ পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বলেন, আমাদের ১৫১ মেগাওয়াটের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ পেলেও কোনো মতে চালাতে পারি। গতকাল মুক্তাগাছায় ৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫ মেগাওয়াট দেওয়া হয়েছিল। পরে দুই মেগাওয়াট বাড়ানো হয়েছিল। পল্লিবিদ্যুৎ সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তাও বলেছেন একই কথা।

এছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে আউশ ও রোপা আমনের ক্ষেতে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়। লোডশেডিংয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি ( নেসকো) ও পল্লিবিদ্যুৎ সমিতি নওগাঁর কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন। এ কারণে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে।

এ ব্যাপারে নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহে নওগাঁর গ্রাম ও শহরে লোডশেডিং বেড়েছে। দিনরাত প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে গ্রাম এলাকায়। এসব এলাকার শতভাগ গ্রাহকই পল্লিবিদ্যুতের।

নওগাঁ পল্লিসমিতি-১ ও সমিতি-২ এর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে নওগাঁয় পল্লিবিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা ৭ লাখ ৮৫ হাজার। এই পরিমাণ গ্রাহকের প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ১৫২ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশ লিমিডেট চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছে।

বর্তমানে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকার ফসলি মাঠজুড়ে আউশ ধান রোপণের কাজ চলছে। কৃষকরা রোপা আমন রোপণের জন্য বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। বৃষ্টি না থাকায় কৃষকেরা গভীর-নলকূপ থেকে জমিতে সেচ দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন। এ ছাড়া নওগাঁয় চালকলসহ ছোটবড় প্রায় ২ হাজার কলকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা থাকে। পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমের কারণেও বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

নওগাঁর উকিলপাড়া মহল্লার গৃহিণী শান্তা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ যায় আর আসে। এক ঘণ্টা থাকলে আবার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা থাকছে না। এদিকে আবার রোদ-গরম। খুব অশান্তি অনুভব করছি। বাচ্চার ঠিকমতো পড়াশোনাও হচ্ছে না। দ্রুত সমস্যার সমাধান না করা হলে অসুস্থ হয়ে যাব আমরা। শহরের তাজের মোড়ের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার মতো বয়স্ক মানুষকে গরমে খুবই অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। একে তো গরম, তার মধ্যে আবার লোডশেডিং, খুবই সমস্যা হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের কারণে নওগাঁ বিসিক শিল্প নগরীসহ ছোট-বড় কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন কারখানাগুলোতে কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে মালিকদের। জেলা শহরের ফিরোজপুর মোড় এলাকায় অবস্থিত জাহেরা রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এবং মিলের গুদামে ধানের মজুত থাকলে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ মণ চাল উৎপাদন হয়। লোডশেডিংয়ের কারণে এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন চাল উৎপাদন এখন ১৫০ মণের নিচে নেমে এসেছে।

মহাদেবপুর উপজেলা সদরের জামান রাইস মিলের মালিক জামান দেওয়ান বলেন, বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ পাচ্ছি না আমরা। আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে এমন সমস্যা চলছে। এমনটা চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে আমাদের। তাই দ্রুত বিদ্যুৎ লোডশেডিং বন্ধ করতে বিদ্যুৎ বিভাগের দৃষ্টি কামনা করছি।

মুঠোফোনে কথা হয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অফ বাংলাদেশের লিমিটেডের রাজশাহী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কয়েক দিন আগে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বিষয়টির ব্যাখ্যা করেছেন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads