দেশে ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছেন শতাধিক গডফাদার। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুনের মতো বড় অপরাধ করার মতো সাহস ও শক্তি জোগাচ্ছেন এসব গডফাদার। যেকোনো ঘটনার পর এসব কিশোর গ্রুপ আলোচনায় এলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে তাদের ‘শেল্টার’ বা প্রশ্রয়দাতা ওইসব গডফাদার। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিশোর গ্যাংগুলোর তালিকা করার পাশাপাশি গডফাদারদেরও তালিকা করছে। ডাটাবেজ করা হচ্ছে কিশোর গ্যাংগুলোরও। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোরদের সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ, বয়সজনিত ‘হিরোইজম’ মনোভাবের কারণেই এ ধরনের পথে পা বাড়াচ্ছে তারা।
গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আলেচিত হচ্ছে। প্রথমে এ ধরনের গ্যাংগুলো রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে থাকলেও এখন তা নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রংপুর, রাজশাহীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কিশোরকে দেখলে এখন সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকে। পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ড্রয়িংরুমে কিংবা অফিসেও দেখা যায় গ্যাংয়ের তথাকথিত গ্রুপ লিডারদের। এরা কিশোর বলে আইনের সুবিধা পাওয়ায় দণ্ডবিধির আশ্রয় নিয়ে পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাদের আটক করে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠাতে হয়। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছে এদের প্রশ্রয়দাতারা।
বিপথগামী এসব কিশোর এলাকায় মাদক ব্যবসা-সেবন, চাঁদাবাজি এমনকি হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ১১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, এই কিশোর গ্যাং বা গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে শতাধিক গডফাদার। পর্দার আড়ালে থেকে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে গডফাদাররা কিশোর গ্যাং দিয়ে এলাকায় মস্তানি, চাঁদাবাজি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। একেকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। অল্প কিছুদিন পর আবারো আগের অবস্থায় চলে যায়।
এদিকে র্যাবের পক্ষ থেকে রাজধানীতে সক্রিয় এলাকাভিত্তিক ৫০টি গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা করা হয়েছে। এই ৫০টি গ্যাংয়ের ৫০ জন গডফাদার রয়েছে। যেসব গ্যাংয়ের তালিকা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আছে পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েস, বিগ বস, নাইন স্টার, নাইন এম এম বয়েস, এনএনএস, এফএইচবি, জিইউ, ক্যাকরা, ডিএইচবি, ব্ল্যাক রোজ, রনো, কে-নাইন, ফিফটিন গ্যাং, পোটলা বাবু, সুজনা ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান, থ্রি গোল, শাহীন-রিপন এবং নামিজ উদ্দিন গ্যাং।
মিরপুর এলাকার যেসব গ্যাংয়ের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে বিহারি রাসেল গ্যাং, বিচ্ছু বাহিনী, পিচ্চি বাবু ও সাইফুল গ্যাং, ‘সি’ ব্লকের সাব্বির গ্যাং, ‘ডি’ ব্লকের বাবু-রাজন গ্যাং, ‘চ’ ব্লকের রিপন গ্যাং, শাহীন-রিপন গ্যাং এবং নাজিম উদ্দন গ্যাং।
আরো আছে তেজগাঁয়ের মাঈনুদ্দিন গ্যাং, কাফরুলের নয়ন গ্যাং, তুরাগের তালাচাবি গ্যাং, ধানমন্ডির নাইন এমএম, একে-৪৭, ফাইভ স্টার গ্রুপ, রায়ের বাজারের স্টার বন্ড গ্রুপ ও মোল্লা গ্রুপ, মোহাম্মদপুরের গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, আঠিপাড়ার শান্ত গ্রুপ ও মেহেদী গ্রুপ, খ্রিস্টানপাড়ার সোলেমান গ্যাং, ট্রান্সমিটার মোড়ের রাসেল ও উজ্জ্বল গ্যাং, হাজারীবাগের বাংলা ও গেন্ডারিয়ার লাভলেট, হাতিরঝিলের লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল, টিকটক-খাইছি, কোপাইয়া দে ও ঝিরঝির গ্রুপ, বংশালের জুম্মন গ্যাং, মুগদার চান-জাদু, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভান্ডারি গ্যাং, চকবাজারের টিকটক গ্যাং ও পোটলা সিফাত গ্যাং এবং শ্যামপুরের ফইন্নি গ্রুপ।
ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম শহরে আছে অন্তত ছয়টি গ্যাং। খুলনা শহরে সাতটি, সিলেট শহরেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে সাত থেকে আটটি গ্যাং।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এ কে খন্দকার আল মঈন বলেন, দেশে কিশোর গ্যাং কালচার ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে। র্যাবের ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাটালিয়নগুলোতে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিশোর গ্যাংদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজও তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এই কিশোর গ্যাংদের গডফাদার রয়েছে। ঢাকায় এ রকম গডফাদার রয়েছে ৫০ জন। আর সারা দেশে গডফাদারের সংখ্যা হবে শতাধিক। এসব কিশোর অপরাধীর গডফাদারদের বিষয়েও র্যাব সজাগ আছে বলে জানান তিনি।
এদিকে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবারের পক্ষ থেকেই প্রথমে যেকোনো অপরাধের সাথে যেন কিশোররা জড়িয়ে না পড়ে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, এসব ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে থানায় যেসব মামলা বা তথ্য নথিভুক্ত হয়, সেটি কিশোর অপরাধ বলে কোনোভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কিশোররা এখন প্রযুক্তির উদ্ভাবন বা অগ্রগতির কারণে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে। নিজ দেশের সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কিশোররা উদাসীন হয়। অনেক বিষয় তারা মানতে চায় না। এই যে মানতে চায় না-এই জায়গা থেকে তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য তৈরি করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। এই জায়গাগুলোতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
তিনি আরো বলেন, করোনার মধ্যে কিশোরদের মধ্যে একটা অস্থিরতা আছে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মধ্যে একটা দায়িত্ব রয়েছে। যেহেতু তারা অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন, তারা কিছুটা হলেও কাউন্সেলিং করে বা তাদের অনুপ্রেরণা দিয়ে বা এই সময়কে অতিক্রম করার জন্য মানসিকভাবে দৃঢ় এবং সচেতন করতে পারেন।
তিনি বলেন, কিশোরদের মধ্যে ‘অ্যাডভ্যানচার ফিলিং’ বা ‘হিরোইজম’ ভাব দেখা যায়। কিশোর বয়সে এমন একটা পরিবেশে বেড়ে উঠলে সেখানে অপরাধী হয়ে উঠতে সহায়তা করে। তারা এই বয়সে এমন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে বা ফলো করে, সেখান থেকেই তারা অপরাধের দিকে ধাবিত হয়।





