মুক্তমত

শহীদ আসাদ প্রেরণার উৎস

  • প্রকাশিত ২৬ জানুয়ারি, ২০২১

অনন্য প্রতীক রাউত

 

সোনালি, সমৃদ্ধির বাংলাদেশে আজ আমরা বাস করছি তা একদিনে তৈরি হয়নি। লাখো মানুষের আত্মত্যাগ বা সংগ্রামীর ভূমিকার জন্য আমারা পৌঁছেছি আজকের এই বাংলাদেশে। যারা মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে দেশের জন্য, দশের জন্য এগিয়ে গেছেন তারাই একেক জন আসাদ। যারা হাজার বছর ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে আমাদের হূদয়ে। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় সমুজ্জ্বল থাকবে যাদের নাম।

প্রতি বছর ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদ দিবস পালিত হয়ে থাকে অনেকটাই নীরবে গুটিকয়েক দেশপ্রেমিক লোকের উৎসাহে। ১৯৬৯ সালের এই দিনে পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের ছাত্রসমাজের ১১-দফা কর্মসূচির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে জীবন দেন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান। আসাদ শহীদ হওয়ার পর তিন দিনের শোক পালন শেষে, ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১-দফার ভিত্তিতে সর্বস্তরের মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার নামে ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে। সংঘটিত হয় ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। পতন ঘটে আইয়ুব খানের। আরেক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় বসে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সত্তর সালের সেই অভূতপূর্ব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু ইয়াহিয়া ক্ষমতা না ছাড়ার জন্য নানা টালবাহানা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তর সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

যুগে যুগে স্বৈরাচারী, দেশদ্রোহী শাসকরা সবসময়ই ছাত্রদের আটকে রাখার চেষ্টা করেছে। ছাত্রসমাজ ফুঁসে উঠলে যে অগ্নিসংগ্রামের সূচনা হয় সেই দাবানলকে দাবিয়ে রাখার সামর্থ্য কোনোভাবেই কামান বা বন্দুকের গোলার নেই। স্বাভাবিকভাবেই অবৈধ শাসকরা ছাত্রদের আটকে রেখে তারা অন্যায়-অবিচারের মাধ্যমে স্বার্থ হাসিলের নোংরা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। স্বাভাবিক অধিকার প্রাপ্তিও যেন দুঃসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রসমাজের ভূমিকা সর্বদাই চিরস্মরণীয়। কেননা অন্যায়-অবিচার বা স্বৈরাচারের পথরোধ করে মুক্তির দিশারী হয়ে আলোর সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে ছাত্রসমাজই। মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে আসাদরা যে ভূমিকায় ছিলেন তা রাজপথের ‘বেতাজ বাদশাস্বরূপ’।

এখন যেমন বছরের শুরুতে বিনামূল্যে বই পৌঁছে যায় শিক্ষার্থীদের হাতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফিরে পেয়েছে শান্ত পরিবেশ, ক্যাম্পাসগুলোতে এখন আর ফোটে না বোমা বরং ফোটে বসন্তের ফুল, তেমনি কয়েক দশক আগেও পরিস্থিতি ছিল এমন। অশান্তির ধূলিময় বাতাস তখন ছড়িয়ে ছিল সর্বত্র। ছিল না প্রয়োজনীয় শিক্ষা কাঠামো বা শিক্ষানীতি। যুগে যুগে লড়াই করেও মন গলানো যায়নি মৌলবাদী, স্বৈরাচারী শাসকদের। ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত চেতনা বা দেশাত্মবোধ। ছাত্রসমাজ দমে যায়নি, অব্যাহত রেখেছে সংগ্রাম। সংগ্রামের পথপরিক্রমায় পালাবদল হয় ক্ষমতার। জনগণ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রায়। প্রণীত হয়েছে দীর্ঘদিনের দাবি ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’। লড়াই, সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত এই জাতীয় শিক্ষানীতি ছাত্রসমাজের জন্য উপহার। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন, মানসম্পন্ন বা যুগোপযোগী হয়েছে জাতির এগিয়ে চলার প্রধান মানদণ্ড।

ছাত্রজীবন যেমন বীজ বপণের সময় তেমনি সময়ের প্রয়োজনে অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজেকে বা নিজেদেরকে গড়ে তোলার উপযুক্ত প্ল্যাটফরম। বাংলার দামাল ছেলেরা বারবার দেখিয়েছে নিজেদের রক্তের তেজোদীপ্ত শক্তিকে। ’৪৮-৭২ কিংবা ’৭৫-৯৬ সবসময়ই ছিল তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ দেশমাতৃকার টানে, দশের প্রয়োজনে। আসাদরা মরে না বরং প্রতিটি তেজোদীপ্ত তরুণের পথচলার শক্তি হয়ে অবস্থান করে হূদয়ের অন্তরালে। তারা অমর, তারা অম্লান। কথিত গণবন্ধু বা ছাত্রবন্ধু উপাধির লোভে তারা লড়াই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় না বরং দেশের স্বার্থে জনকল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে নিঃস্বার্থভাবেই তারা এগিয়ে চলে অবিরাম, রাজপথে ঢেলে দেয় তাজা রক্ত। বিনম্র শ্রদ্ধায় করি স্মরণ রাজপথের সংগ্রামী ছাত্রনেতা শহীদ আসাদ, যিনি আমাদের লড়াই সংগ্রামের অগ্রসৈনিক হিসেবে আজীবন থাকবেন হূদয়ের মণিকোঠায়।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads