শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা

  • প্রকাশিত ৮ মে, ২০২১

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ডাক্তার, ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের বিতর্ক যুদ্ধ বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমনকি এ বিষয়টি নিয়ে আদালত পর্যন্ত যাওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি আমরা হয়তো ভুলে গেছি বা যাচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দ্বারা যে প্রশ্নের তৈরি হয়েছে তা কেন ঘটল বা তার সমাধান কী? এটা কি কোনো নিছক ক্ষণস্থায়ী বিষয়? এসবের কারণ অনুসন্ধানে দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে। তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব বিষয় নীতিহীন শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। যারা তর্কে জড়িয়েছেন তারা অবশ্যই দেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করেছেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেসব ভাষায় একজন আরেকজনকে হেনস্তা করেছেন তা কোনো শোভনীয় কাজ হয়নি। ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। ভুল বোঝাবুঝিটা সুন্দরভাবে সমাধান করা যেত।

ইদানীং আমরা লক্ষ করছি যে, আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন একটা অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষই আইন ভাঙতে পছন্দ করেন বা করে থাকেন। এটা অনেকেই ক্রেডিট মনে করে থাকেন। এবং সবাই ক্ষমতার ব্যবহার দেখাতে চান এবং ক্ষমতাসীন হতে চান। কিন্তু কেন? এর দুটো দিক থাকতে পারে। একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে সামাজিক শিক্ষাটা অর্জিত না হওয়া এবং অন্যটি হলো রাষ্ট্র আইনভাঙা ব্যক্তিদের সাহায্য করে ও ক্ষমতার ছায়াতলে রাখে। অপরাধী ব্যক্তিরা যখন অধিক ক্ষমতা ভোগ করে এবং রাষ্ট্র তার পেছনে দাঁড়ায়, তখন এসব মন-মানসিকতার জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সম্প্রতি যে ঘটনাটি মানুষের চোখে এসেছে তা থেকে মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ এ থেকে তেমন একটা হতবাক হয়নি। কারণ এসব ব্যবহারের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত সম্পৃক্ত হচ্ছি। এখন তিন রাস্তা একসাথে হওয়ায় বিষয়টা বড় হয়েছে এবং মানুষের অন্তরের খোরাক হয়েছে। তবে এ বিষয়গুলো যে রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অপরাধকারীদের অপরাধের সাজা এক হলেও অপরাধী, ক্ষেত্রবিশেষে অপরাধটা মানুষের অন্তরে রেখাপাত করে। সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে আমরা যে ব্যবহার পেয়ে থাকি, তর্কে জড়ানো ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিঃসন্দেহে আমরা সেরকম প্রত্যাশা করি না। আমি আগেই বলেছি, তর্কে জড়ানো ব্যক্তিরা অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ শিক্ষিত। মনে প্রশ্ন রয়ে যায় এ সর্বোচ্চ শিক্ষা আমাদের কী উপহার দিচ্ছে? আমরা কি কেবলই টাকা রোজগারের জন্য এ শিক্ষা অর্জন করছি? তাহলে শিক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা কোথায় হারিয়ে গেল?

সভ্যতা দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে। এগিয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সে শিক্ষায় সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে না এটা হতে পারে না। প্রত্যেক অভিভাবক তার সন্তানকে প্রতিনিয়ত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেক পেশার ক্ষেত্রে মানবিক যে বিষয়গুলো, আসলেও সেগুলো রয়ে যাচ্ছে পর্দার পেছনে। ঘটে যাওয়া বিষয়টির সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনটি পক্ষই রাষ্ট্রের ক্ষমতার উঁচু স্তরে রয়েছে, তারপরও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম কেন ভাঙানো প্রয়োজন হলো? মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয় দিয়ে তারা কি নিজেদের আরো শক্তিশালী করে তুলতে চাইছে? তাহলে কি মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন? কিন্তু সত্যিকার অর্থেই যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন তারা কি এমন দেশ চেয়েছিলেন? আমার মনে হয় না। এই ঝগড়া, শিক্ষা এবং মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রত্যেকটি পেশার ক্ষেত্রেই সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি যদিও গুরুত্ব সহকারেই নেওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছে না। কারণ কি সেটা সবারই অজানা, তবে ভুক্তভোগী সবাই।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্থ কামানোর নেশায় সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি নিচে চলে যাচ্ছে। অনেকেই মাধ্যমিকে পড়ার সময় ডাক্তার হয়ে গ্রামের মানুষের বিনামূল্যে সেবা করার বাসনা ‘রচনা’য় লিখেছে। কিন্তু ডাক্তারি শেষ করার পর বিসিএস দেওয়ার সময় সামনে চলে আসছে প্রশাসন কিংবা পুলিশ। কেউ কেউ আবার বিদেশ পাড়ি দেওয়ার জন্য ভিন্ন পথও অবলম্বন করছে বা পাড়ি দিচ্ছে। বুয়েট থেকে সদ্য পাস করা ছাত্রটি পুলিশ হওয়ার স্বপ্নও দেখছে। যদিও এসব হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো বাধা নেই বা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এসব হওয়ার পেছনের উত্তরটা রাষ্ট্রের জানা জরুরি এসব বিবাদ মেটানো এবং রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত করার জন্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অতুলনীয়। এটার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়কে এক করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এদের অবদানকে এসব বিষয়ের সঙ্গে মিলালে মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান খর্ব হয় এটা আমাদের মাথায় রাখা জরুরি। রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানো অপরিহার্য এবং সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার মুক্তিযোদ্ধাদের পরবর্তী প্রজন্ম সেটাকে ধরে রাখবে সেটাও এদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে। না হলে সম্মানকারীরা অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এটা ভুলে গেলে চলবে না। তর্কের ঘটনাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে যে দিক থেকে বিশ্লেষণ করেছে সেদিক থেকেই ফলাফল পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিশ্লেষণের ফলাফলটা ভালো আসেনি, যা সমাজের জন্য অশনিসংকেত। প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র আলাদা। প্রত্যেকেই নিজেদের কর্ম করে থাকে। কারো কর্ম বড়-ছোট প্রশ্ন নয়। আলাদা কর্মের ফলাফল আলাদা হবে এটাই স্বাভাবিক। এই বিষয়টি অনেকের মনে সন্দেহ হয়েছে, নিছক রাগের মাথায় এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তবে বিষয়টি এ বিশ্লেষণ পাওয়ার যোগ্য নয় বলেই মনে হয়। কারণ আমাদের সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রায় প্রত্যেকটি শিশু এ মনোভাব নিয়েই তার জীবনকে সামনের দিকে নিয়ে এগিয়ে চলছে বর্তমান সময়ে। মনের দিক দিয়ে বড় না হয়ে বেশি বেতন, ক্ষমতা বা বড় চাকরির দিকে ঝুঁকছে। ফলে সবার মধ্যে বাসনা জন্ম নিয়েছে অর্থে বিত্তে বড় হতে হবে। এটাই হচ্ছে বর্তমান শিক্ষা বা চাকরির বাজারের অবস্থা। কিছু যে ব্যতিক্রম নয় তা কিন্তু না। তবে তা খুব নগণ্য।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা আমাদের সন্তানদের সত্যিকার অর্থে বড় হওয়ার শিক্ষাটা দিতে পারছি না। বর্তমান করোনাকালে জাতির যখন মুমূর্ষু অবস্থা সেখানে রাষ্ট্রের বড় তিনটি বিভাগের মধ্যে এরকম বড় থাকার লড়াই জাতিকে ভাবিয়ে তুলছে। এ ঘটনা যতই ধামাচাপা দেওয়া হোক না কেন, অন্তরের বিভাজন দূর করা অনেক জটিল, যদি না গোড়ায় সে ভাবটা জাগিয়ে না তোলা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টা সামনে এনে জাতির কাছে বিষয়টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তিনজনই যেহেতু তাদের বাবাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করেছেন, সেখানে বিষয়টা অনেকটাই হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। সাধারণ জনগণের মাঝে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি রেখাপাতের জন্ম হয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে আমরা এ রকম কিছু আশা করতে পারি না বা উচিত নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান আলাদা তাদের নিয়ে ক্ষমতা দেখানোর মতো কিছু নেই। কারণ ক্ষমতা দেখালে অনেক সময়ই সম্মানের জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়। যারা বেশি ক্ষমতা দেখান বা দেখাতে চান তারা সাধারণ মানুষের কাছে সম্মানিত থাকেন না বরং সাধারণ মানুষের হাস্যরসে পরিণত হন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, শিক্ষা ও চাকরি ব্যবস্থায় একটা আমূল পরিবর্তন না হলে মানুষ ক্ষমতা ও অর্থের দিকেই ধাবিত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাবে। ফলে এরকম ঘটনা বা এর চেয়ে বড় ঘটনা প্রায় সময়ই ঘটবে এবং ফলাফলও ভালো হবে না।

রাজনীতি হবে রাজনীতির জায়গায়। বর্তমানে রাজনীতি যেভাবে সকল স্তরে ছড়িয়ে যাচ্ছে সেটা কোনো ভালো লক্ষণ হতে পারে না। শিক্ষায় মানবিক দিক বেশি গুরুত্ব দিয়ে সৃজনশীল সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুন্দর দেশ দিয়ে যেতে হবে বর্তমান প্রজন্মকে। না হলে তার দায়ভার আমাদেরকেই বহন করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মের সবাইকে একটা বিষয়ে একমত হতে হবে যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় না করে মানুষ করতে হবে। তাহলে মানুষের মাঝে জন্ম নেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হলে এসব বিষয় আর সামনে আসবে না। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় সবচেয়ে বেশি, কেননা রাষ্ট্র শিক্ষা কাঠামোকে এভাবে গড়ে তুলতে পারছে না। আর আলোচ্য অংশের আরেকটি বিষয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি। ছোটখাটো বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টি সামনে চলে আসলে তা জাতির জন্য অবশ্যই লজ্জার। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।

লেখক : নীলকণ্ঠ  আইচ  মজুমদার

প্রভাষক, আলীনগর কারিগরি ও বাণিজ্যিক কলেজ, ঈশ্বরগঞ্জ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads