ভ্যাকসিন নিয়ে নানা অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দ্রুতই কেটে যাওয়ার আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের প্রত্যাশা, আগামী আগস্ট মাস থেকে দেশে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করা যাবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি মাসের (জুলাই) ৫ বা ৬ তারিখে কোভ্যাক্সের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার আড়াই মিলিয়ন (২৫ লাখ) ভ্যাকসিনের ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) ডোজ দেশে এসে পৌঁছবে। অন্যদিকে চীনা সিনোফার্মের সাথে করা চুক্তির দেড় কোটি ভ্যাকসিনের মধ্যে প্রথম চালানে ২০ লাখ ডোজ টিকাও এই সময়ের মধ্যেই হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের মিনিস্টার কাউন্সিলর এবং ডেপুটি চিফ অব মিশন হুয়ালং ইয়ান। সিনোফার্মের অবশিষ্ট ১ কোটি ৩০ লাখ ডোজও এ মাসের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিক ভি টিকা আমদানির জন্য শিগগির চূড়ান্ত চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। আগস্ট নাগাদ এই টিকা পাওয়া যেতে পারে। সবমিলিয়ে দেশে বর্তমানে ভ্যাকসিনের যে সংকট রয়েছে তা চলতি জুলাই এবং আগস্টের মধ্যেই অনেকটা দূর হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন জোট ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন-গ্যাভি’র সদস্য এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজামউদ্দিন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘জুলাইয়ের মধ্যে মডার্না এবং সিনোফার্মের ভ্যাকসিন দুটি পাওয়া যাবে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগস্টের মধ্যে স্পুটনিক ভি টিকা পাওয়া যাবে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, রাজনৈতিক কারণে ভ্যাকসিন আসতে দেরি হলেও এটি মানবতার জন্য ইতিবাচক। কারণ, এই দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকেই টিকাগুলোর বিভিন্ন ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। টিকা নিয়ে সরকারের দেন দরবারে অগ্রগতি হচ্ছে জানিয়ে ডা, নিজামউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এই মুহুর্তে আমাদের বাল্ক ভলিউমে ভ্যাকসিন দরকার। লাখ লাখ নয়, প্রয়োজন কোটি কোটি টিকা। তবে, বিভিন্ন দেশের সাথে টিকা নিয়ে যে যোগাযোগ হচ্ছে তার প্রোগ্রেস অনেক।’
বর্তমানে বিশ্বে ১৭টি ভ্যাকসিন চলমান রয়েছে। তবে এসব ভ্যাকসিনের বেশিরভাগই এখনো সম্পূর্ণভাবে ট্রায়াল সম্পন্ন হয়নি। একারণে অনেকেই বড় আকারের উৎপাদনে যেতে পারছে না। তবে ফাইজার এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার উৎপাদন বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে। এই দু’টি টিকার কার্যকারিতা অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বলে উল্লেখ করে ডা. নিজামউদ্দিন বলেন, ‘ফাইজারের আরেকটি ভালো উন্নতি হয়েছে। সেটি হলো, এটি আগে মাইনাস ৭০ থেকে ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সংরক্ষণ করা লাগতো। সেটিকে তারা মডিফাই করে বর্তমানে অ্যাস্ট্রেজেনেকার সমপর্যায়ে অর্থ্যাৎ, ২ থেকে ৮ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ৩১ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে।’
এদিকে ভ্যাকসিনকে অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা না হলে দেশে ভ্যাকসিনের সংকট হতো না বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এ কারণে ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়াকে সেই রাজনীতিরই অংশ বলে মনে করছেন তারা। তবে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অ্যাস্ট্রাজেনেকার কাঁচামালের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় বাংলাদেশেরও এই টিকা পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ভ্যাকসিনের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারত তার ভ্যাকসিন ক্যাপাসিটি রিগেইন করেছে। বাইডেন প্রশাসন অ্যাস্ট্রাজেনেকার কাঁচামালের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় আবার সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে ৩টি ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। এছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিক-৫ তারা উৎপাদনের চেষ্টা চালাচ্ছে। সেক্ষেত্রে যে পরিমাণ উৎপাদন হবে, জুলাই এবং আগস্টের মধ্যে সেখানে ভ্যাকসিনের সংকট থাকবে বলে মনে হয়না। তখন বাংলাদেশও হয়তো তাদের কাছ থেকে অ্যাস্ট্রজেনেকার ভ্যাকসিন পাব।’
এদিকে আজ থেকে সারাদেশে চীনের সিনোফার্ম টিকা দেওয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত ভার্চুয়াল বুলেটিনে অংশ নিয়ে এ তথ্য জানান, ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক। তিনি জানান, দেশের সকল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, ২৫০ বেড হাসপাতাল ছাড়াও চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতাল, সৈয়দপুর সদর হাসপাতালে এ টিকাদান কর্মসূচি চলবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত। এ ছাড়াও রাজধানী ঢাকায় ইতোমধ্যে করোনাভাইরাস টিকাদান কর্মসূচি চলেছে ৪৮টি কেন্দ্রে। কিন্তু সেখান থেকে এবারে ৮টি কেন্দ্র বাদ দিয়ে ৪০টি কেন্দ্রে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হবে বলে জানান ডা. শামসুল হক।





