ভাস্কর শিল্পী আইভি জামান
শিল্পী অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খানের চারুকলায় এসে মোস্তাফা মনোয়ার স্যার ও পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষক আনোয়ার স্যারকে পেলেন। পেইন্টিং বিভাগের। ইতোমধ্যে যুবক হামিদুজ্জামান ওয়াটার কালারের জন্য পরিচিত হয়ে গেলেন। তখন সময়টা ছিল উনিশশো চৌষট্টি। মুস্তাফা মনোয়ার স্যার ও আনোয়ারুল হক স্যার পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।আনোয়ার স্যারকে হামিদুজ্জামান কাজ দেখানো জন্য হোস্টেলে নিয়ে গেলেন। চারুকলার আবাসিক হোস্টেল। উনি যথাসময়ে হোস্টেলে হাজির হলেন। হোস্টেলে নিয়ে প্রায় শতাধিক কাজ দেখানো সুযোগ পেলেন। স্যার খুশি হলেন, উৎসাহ দেওয়ার জন্য বললেন,কাল আসো আউটডোরে নিয়ে দেখাব। নবাবগঞ্জের পাশে বুড়িগঙ্গার তীরে পর পর তিন দিনে একটা ছবি আঁকা দেখালেন ও একটি ছবি শেষ করলেন। হামিদুজ্জামান ড্রইং বিষয় কিছুটা উপেক্ষা করে ছবিতে একটা বিষয়ে নিয়ে নিজস্ব অনুভূতির প্রকাশ করে। এখানেই হামিদুজ্জামান স্বতন্ত্র। চতুর্থ বর্ষের শিক্ষক ছিলেন আব্দুল বাসেত।বিক্রমপুর নিবাসী, সদ্য আমেরিকায় পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে চারুকলা শিক্ষকতা যোগ দেন। উনি ছিলেন ব্যতিক্রমী প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একদিন হামিদুজ্জামানকে ডেকে বললেন কাল তুমি পরিষ্কার কাপড় পরে আসবে।
তখনো হামিদুজ্জামান খানের ড্রেস ছিল পায়জামা ও ব্যাপারী শার্ট। কাল বাম্রার প্রেসিডেন্ট নেউইন আসছেন তুমি থাকবে। হামিদুজ্জামান নিজের হস্তে আঁকা ছবিটি উপহার দিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন। পঞ্চম বর্ষের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক ছিলেন শিল্পী আমিনুল ইসলাম। তিনি হামিদুজ্জামানের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমিনুল ইসলামকে আধুনিক শিল্পের প্রতিকৃতি বলা হয়। তখন ডিগ্রিতে সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট নিতে হতো। তার সাবজেক্ট ছিল সিরামিক ও প্রিন্ট মেকিং, সেখানে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী গোলাম কিবরিয়া জাপানে বহু বছর ছিলেন পড়াশোনা ও জাপানে পুরস্কারপ্রাপ্ত। অধ্যাপক শফিকুল আমীন কলকাতা থেকে কলকাতা ও ইংল্যান্ড থেকে হায়ার ডিগ্রি করে অধ্যাপনা করেন। হামিদুজ্জামান গুণী শিল্পীদের সানিদ্ধে আসেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তৎকালে চারুকলা ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন। শিল্পাচার্য প্রায় আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে বিদেশে যেতেন। তখন চারুকলায় পর্যায় ক্রমে দায়িত্বে থাকতেন শিল্পী আনোয়ারুল হক শিল্পী শফিকুল আমীন। শফিকুল আমীন কলকাতা ওরিয়েন্টাল বিভাগ থেকে পাস করেন। হামিদুজ্জামান যখন শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তখনই মারাত্মক রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়। সাইকেল চালিয়ে হোস্টেলে গিয়েছিলেন, প্যালেট আনতে। পাশের সাইকেলে ছিলেন। অধ্যাপক আব্দুস শাকুর তখন তিনি চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। হামিদুজ্জামান যখন শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন উনিশশ সাতষট্টি সালের এক মারাত্মক সরক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পান। মাথার স্কাল ভেঙে টুকরো হয়ে যায়। আর্টস ফ্যাকাল্টির সামনে মেইন রোড এসেই ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে হামিদুজ্জামান ব্রেইনে প্রচণ্ড রকম আঘাত পান। সাথে সাথে হসপিটালাইজভ হন। সাথে ছিলেন আব্দুস শাকুর শাহ্ চারুকলার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। উনি হামিদুজ্জামানকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করান। পরে তিনিই চারুকলায় খবর দেন।
হামিদুজ্জামান ছিলেন চারুকলার একজন আলোকিত ছাত্র। তার এই দুর্ঘটনার চারুকলা ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা মর্মাহত হন। অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্যার ও শফিকুল আমীন তার চিকিৎসার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ডাক্তারদের বললেন, দরকার হলে ওরে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। ছেলেকে বাঁচাতে হবে। হামিদুজ্জামানের সিরিয়াস অবস্থা... ব্রেইনে... অ্যাক্সিডেন্ট করে মাথার স্কাল ফেটে যায়। ব্রেইন আউট হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তারা বলছেন, না, এ তো মারাই যাবে, চিকিৎসা করে কি লাভ?
তখন ডাক্তার আসিরউদ্দিন উনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডিরেক্টর ছিলেন, উনি বললেন আমি চেষ্টা করে দেখব বাঁচে কি না?... আর বাঁচলেও হয়তো মেমোরি থাকবে না। কারণ এ তো ব্রেইন, তা আর কিছু করার নেই। হয়তো হাতটা প্যারালাইজড হয়ে যাবে। বাঁ হাত প্যারালাইজডও হয়ে গেছিল তখন। হাত ওপরে তুলতে পারত না। মাথার ব্লাডটা বের করা হলো। হামিদুজ্জামানের যখন প্রথম সেন্স হলো তখন আবেদিন স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। কী, আমারে চিনছ? আবেদিন স্যারকে দেখে সেন্স ফিরেছে পুরোপুরি।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বললেন, তুমি ভালো হয়ে যাবে, কোনো অসুবিধা নেই। তোমার জন্য আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। উনি ছেলেদের ডেকে বললেন, তোমরা অলটারনেট ডিউটি করো। হামিদুজ্জামানের যাতে কোনো অসুবিধা না হয়। চারুকলার ছেলেরা তাঁর জন্য অনেক করেছে। আস্তে আস্তে সব কিছু ঠিক হয়ে গেল। বাঁ হাত আবার কাজ করতে শুরু করল। ব্যালেন্সটা একটু কম.... কাজ করলে কাজটি সরাতে পারছে।





