মুক্তমত

শৈত্যপ্রবাহ ও দরিদ্র মানুষের কষ্ট

  • প্রকাশিত ৩০ জানুয়ারি, ২০২১

ড. মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন

 

 

বাংলাদেশে জানুয়ারি সবচেয়ে শীতলতম মাস। দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষজনের জন্য এই মাসটি খুবই কষ্টকর। কারণ, শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপে মানুষজন বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা খুব দুর্ভোগে ভোগে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও ঘটে। আবহাওয়াবিদরা ধারণা দিয়েছেন যে, এই বছরের মধ্য জানুয়ারিতে শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপ বাড়বে। তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে। যেমন বিবিসির তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি মাসে রংপুর বিভাগের তাপমাত্রা ১০ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই তাপমাত্রাকে শৈত্যপ্রবাহের নির্দেশক বলা হলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তা খুবই সাধারণ। উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের শৈত্যপ্রবাহের রেকর্ড থেকে বলা যায় যুক্তরাষ্ট্রের মনটানা, কলোরাডো ও নেবারেস্কা রাজ্যে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৯ সালে কানাডায় রেকর্ড করা হয়েছিল মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সে তুলনায় বাংলাদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ইতিহাস তেমন নিম্নগামী নয়। বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল ২০১৮ সালে তেঁতুলিয়ায়।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ১০ ডিগ্রি বা তার নিচের তাপমাত্রা মানুষের জন্য ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায়। এর পেছনের কারণগুলো অপরিচিত নয়। নিম্ন আয় ও দরিদ্রতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাধারণত শৈত্যপ্রবাহ দেশের উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগের চেয়ে উত্তরাঞ্চল তথা রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অধিবাসীদের আয় কম। ফলস্বরূপ, নিম্ন আয়ের মানুষজন অভাব অনটনের সাথে বসবাস করে। মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য তথা বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। তাই দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য সাধারণ শীতই খুব কষ্টের। শৈত্যপ্রবাহ এই কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়।

নিম্ন উপার্জনকারীদের মধ্যে দিনমজুর ও ভূমিহীন কৃষক অন্যতম। তাদেরকে দিনের শুরু থেকেই কাজের সন্ধানে ঘর থেকে বের হতে হয়। শীতের সকালে যে কোনো মানুষের জন্যই ঘর থেকে বের হওয়া কষ্টের যদি তার গরম পোশাকের প্রস্তুতি যথেষ্ট না থাকে। উন্নত মানের ও ভালো গরম পোশাক শীতের সাথে অভিযোজন করার জন্য খুবই জরুরি কিন্তু তা বহু দরিদ্র মানুষের জন্য বিলাসিতা। তাছাড়া তাদেরকে কৃষি জমিতে মাটি, পানি ও কাদা নিয়ে কাজ করতে হয়। সাধারণ শীতে এবং শৈত্যপ্রবাহের সময় এরূপ কাজ সত্যিই কষ্টকর। কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে এই কাজ করতেই হবে।

বহু দিনমজুর আছেন যারা গ্রাম থেকে শহরে এসে কাজ করেন আবার কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে যান। স্বল্প খরচে যাতায়াতের জন্য অনেকেই বাসের ছাদে ওঠেন। একদিকে নিম্নমানের শীতবস্ত্র অন্যদিকে উন্মুক্ত ছাদে শীতের ঠান্ডা হাওয়া। শীতের সকালে এমন ভ্রমণ নিশ্চয়ই কষ্টের। এতে শীতকালীন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে। শৈত্যপ্রবাহের সাথে অভিযোজন করার জন্য গ্রামবাংলায় আগুন পোহানোর সংস্কৃতি আছে। কিন্তু এতে বিপদও আছে। শীতকালে আমরা পত্রিকার পাতায় দেখি যে প্রচণ্ড শীতে আগুন পোহানোর সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করে এবং গুরুতর জখমেরও শিকার হয় যেমন-হাত ও পা পুড়ে যাওয়া।

শৈত্যপ্রবাহ যেহেতু প্রাকৃতিক, তাই এই অবস্থাকে খুব সহজে এড়িয়ে চলা যাবে না। আর এটি যেহেতু শীতকালের জন্য সাধারণ পরিস্থিতি তাই এটিকে মোকাবিলার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। বিবেচনায় আনতে হবে কিছু জনগোষ্ঠীর জন্য শৈত্যপ্রবাহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কারণ, এতে তারা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, তাদের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং তারা শারীরিক কষ্টে ভোগে।

প্রস্তুতি হতে পারে নানাবিধ। তার মধ্যে দুটি বিষয় অন্যতম। সেগুলো হলো ঘর-বাড়ির অবকাঠামো ও শীতকালীন পোশাক। প্রথমত, উত্তরাঞ্চলের বহু মানুষের ঘরবাড়ি তৈরির নির্মাণসামগ্রী দুর্বল ও টেকসইহীন। যেমন দরিদ্র মানুষেরা মাটি, শন ও নিম্নমানের টিন দিয়ে ঘর তৈরি করে যা প্রকট (গরম বা শীত) আবহাওয়ার সাথে অভিযোজন করার জন্য যথেষ্ট নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ঘর নির্মাণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের যেমন- স্থপতিদের জ্ঞান ও পরামর্শ কাজে লাগাতে পারে। স্থপতিরা জানেন যে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সাথে সংগতি রেখে কীভাবে ঘরের ডিজাইন করা যায় যাতে করে ঘর হয় টেকসই এবং বসবাস হয় আরামদায়ক।

দ্বিতীয়ত, মৌসুমভেদে দরিদ্র মানুষের পোশাকে তেমন বৈচিত্র্য দেখা যায় না। যেমন- গরমকালে নারীরা যে শাড়ি ও পুরুষেরা লুঙ্গি পরিধান করে, সেগুলো তারা শীতকালেও ব্যবহার করে। ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় যে লুঙ্গি শরীরকে সুরক্ষা দেবে সেটি নিশ্চয়ই ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সমান সুরক্ষা দেবে না। ইউরোপের দেশের মানুষের শীতবস্ত্রের ব্যবহারের ধরনকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কৃষি জমিতে পানি ও কাদার মধ্যে তারাও কাজ করে। সেজন্য তাদের রয়েছে যথেষ্ট এবং যথাযথ পোশাকের ব্যবহার। যেমন- পানি ও কাদায় পায়ের সুরক্ষার জন্য তারা গামবুট বা রবারের তৈরি বুট জুতা ব্যবহার করে। জিনসের প্যান্ট বা ঢিলা ও মোটা পোশাক পরে। জ্যাকেট পরে। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ শীতে চাদর ব্যবহার করে যা পরিধান করে কাজ করা সহজ নয়। এর পরিবর্তে, জ্যাকেট পরিধান করা যেতে পারে। মূল সমস্যা হলো বাংলাদেশের দরিদ্র ব্যক্তিরা গামবুট ও জ্যাকেট ক্রয় করার সামর্থ্য নেই। তাছাড়া তথাকথিত বিদেশি স্টাইলের পোশাক পরিধানে সাংস্কৃতিক বাধার ব্যাপারটি রয়েছে। আশা করা যায়, যথাযথ পোশাক তথা গামবুট, জ্যাকটের সহজলভ্যতা ও সচেতনতা সাংস্কৃতিক বাধাকে সহজ করে দিতে পারে।

তাই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সব অঞ্চলের মানুষকে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করবে সেটাই প্রত্যাশিত।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads