বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে ভরা মৌসুমে ঘুরতে আসে কয়েক লাখ পর্যটক। কিন্তু বিপুল সংখ্যক এই পর্যটকের নিরাপত্তায় রয়েছেন মাত্র ২০৮ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ। লোকবল থেকে শুরু করে রয়েছে নানা অবকাঠামোগত সংকট। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চললেও এত অল্প ট্যুরিস্ট পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকরা। নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন জেলা ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তারা।
গত ২২ ডিসেম্বর স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে নারী পর্যটককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাতে কক্সবাজারের গুড ভাইব কটেজ রিসোর্টে অস্ট্রেলিয়ান নারীকে ধর্ষণচেষ্টা, ২০০৫ সালে বিদেশি নারীকে ধর্ষণের ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজার রিজিয়নে একজন পুলিশ সুপারের অধীনে ২৫০ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ খাতা-কলমে থাকলেও রয়েছেন ২০৮ জন। বাকি ৪২টি বিভিন্ন পদশূন্য। ফলে বিপুল সংখ্যক পর্যটককে সামাল দিতে এই বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩ সালে পর্যটকদের নিরাপত্তায় গঠন করা হয় ট্যুরিস্ট পুলিশ। সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত সৈকত পুলিশ ফাঁড়ি ভেঙে যুক্ত করা হয় ট্যুরিস্ট পুলিশে। তখন থেকে কক্সবাজার উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে ট্যুরিস্ট পুলিশকে একটি রিজিয়নে পরিণত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বাড়ানো হয় জনবল।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রসৈকত ছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ৩৫টি পর্যটন স্পট। এসব পর্যটন স্পটের বেশিরভাগ এলাকায় নেই ট্যুরিস্ট পুলিশ। বিশেষ করে সোনাদিয়া, মহেশখালী, খুরুশকুল, হিমছড়ি এলাকা সবসময় পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে। কিন্তু এসব পর্যটন স্পটে নেই ট্যুরিস্ট পুলিশ। নেই কোনো ট্যুরিস্ট পুলিশের ফাঁড়ি কিংবা নিরাপত্তা চৌকি। ফলে এসব এলাকার পর্যটকরা সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন।
বর্তমানে কক্সবাজার শহরে ১৩৫, ইনানী সাব-জোনে ১৮, টেকনাফ সাব-জোনে ১৮, সেন্টমার্টিন সাব-জোনে ২১ ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক সাব-জোনে ১৬ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। তবে এর বাইরে একাধিক পর্যটন স্পট থাকলেও সেখানে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা পুলিশের কার্যক্রম নেই।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজারে পর্যটক আগমনের তুলনায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্য অপ্রতুল। প্রতি মৌসুমে সরকারি ছুটি কিংবা বিশেষ কোনো দিবসে কক্সবাজারে পর্যটকদের আগমন বেশি ঘটে। শহরের সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে দুই লাখের বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে। এসব পর্যটক আবার ভাগ হয়ে সেন্টমার্টিনসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট ভ্রমণ করেন। শুধুমাত্র কক্সবাজারের পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ৫০০-৭০০ ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সোনাদিয়া, মহেশখালী, রামু, খুরুশকুল ও হিমছড়িসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় ট্যুরিস্ট পুলিশ নেই। এসব এলাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমেদ।
জনবল ছাড়াও ট্যুরিস্ট পুলিশের অবকাঠামোর উন্নয়ন দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থ বরাদ্দের অভাবে বেশিরভাগ পর্যটন এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। তাই কোনো পর্যটক বিপদে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে গিয়ে দায়িত্ব পালন করা একজন পুলিশ সদস্যের পক্ষে সম্ভব হয় না।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পে ট্যুরিস্ট পুলিশের জন্য নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন কিংবা ঘর নির্মাণ করলে প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া সহজ হবে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের রয়েছে জেট স্কি তিনটি, স্পিডবোট একটি, বিচ বাইক ১০টি, স্যান্ড সাপোর্ট দুটি, মোটরসাইকেল ২০টি, ট্রাক একটি, পিকআপ তিনটি, মাইক্রোবাস একটি ও জিপ একটি। দায়িত্ব পালন ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজে এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
পর্যটকদের সহায়তয় পাঁচটি বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এগুলো হলো-পর্যটকদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভ্রমণ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা, পর্যটকদের আইনগত সহায়তা প্রদান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, আমাদের যেসব সরঞ্জাম আছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আমাদের ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অনুকূল পরিবেশে পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি আমরা। বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সহায়তা না পাওয়ায় অনেক সময় পর্যটকদের কিছু সমস্যা সমাধান করা যায় না। তবে আমরা চেষ্টা করি, যাতে আমাদের পর্যটন শিল্পটা বিকশিত হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরো বলেন, কক্সবাজারে পর্যটনের উন্নয়নে ট্যুরিস্ট পুলিশকে আরো বেশি কার্যকর করতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণ, লজিস্টিক সাপোর্ট ও স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা, সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রচারণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি, বিজ্ঞাপন সংস্থা যেসব বিলবোর্ড করছে, সেগুলো ট্যুরিস্ট পুলিশের অধীনে থাকা উচিত। এসব বিষয় মনিটরিং করতে জনবল ও অর্থের প্রয়োজন।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, ট্যুরিস্ট পুলিশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্ত করা দরকার। কারণ ট্যুরিস্ট পুলিশ বর্তমানে অভিযানে গেলে জেলা প্রশাসন থেকে ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যায় না। এ কারণে গত দেড় বছরে কক্সবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কোনো অভিযান চালাতে পারেনি ট্যুরিস্ট পুলিশ। এটি নজিরবিহীন ঘটনা। এগুলো সমাধান করা জরুরি।





