আ.স.ম আল আমীন
সমাজ থেকে সর্বপ্রকার দুর্নীতির অবসান ও জুলুমতন্ত্রের বিলোপ সাধনের উদ্দেশ্যে সর্বাগ্রে ও সর্বপ্রধান যে মোক্ষম আঘাতটি হানা হয়েছে তা হচ্ছে সুদের উচ্ছেদ। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর বিশ্ববাসীর কল্যাণ চিন্তা করে মানবতার নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অর্থনীতিতে এক দিগন্তকারী নতুন কর্মসূচির সূচনা করেন। সে কর্মসূচির আলোকে মদিনা শহর অর্থনীতিতে উন্নতি করেছে। তখনকার সময়ে নবীজির কর্মসূচির আদলে মদিনা সভ্যতায়-সৃজনে নির্মাণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তার কর্মনীতি অনুসরণ করে সুদূর স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত-বিশাল মুসলিম বিশ্বে শোষণমুক্ত ও কল্যাণধর্মী নতুন এক অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল।
সেই অর্থনীতি ছিল সুদমুক্ত, তাছাড়া ইসলামে সুদ ও সুদভিত্তিক সমস্ত কারবার ও লেনদেন চিরকালের জন্যে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল কোরআনে এ প্রসঙ্গে এর ইরশাদ হয়েছে-‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত-২৭৫) রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তারা সবাই সমান পাপী।’ (তিরমিযি, মুসলিম) ইসলামী অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় যাবতীয় অসৎ কাজের মধ্যে সুদকে সবচেয়ে পাপের জিনিস বলে গণ্য করা হয়েছে। বস্তুত সুদের মতো সমাজবিধ্বংসী অর্থনৈতিক হাতিয়ার আর দুটি নেই। সুদের কুফলগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করলেই বোঝা যাবে কেন সুদ চিরতরে হারাম ঘোষিত হয়েছে।
সমাজ শোষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম : একদল লোক বিনাশ্রমে অন্যের উপার্জনে ভাগ বসায় সুদের সাহায্যেই। ঋণগ্রহীতা যে কারণে টাকা ঋণ নেয় সে কাজে তার লাভ হোক বা না হোক সুদের অর্থ তাকে শোধ করতেই হবে। এর ফলে বহু সময়ে ঋণগ্রহীতাকে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হলেও সুদসহ আসল টাকা পরিশোধ করতে হয়। সুদ গ্রহীতারা হচ্ছে সমাজের পরগাছা। এরা অন্যের উপার্জন ও সম্পদে ভাগ বসিয়ে জীবনযাপন করে। সমাজের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এদের কোনো অবদান থাকে না।
সুদ আর মুনাফার মধ্যে পার্থক্য : অনেকেই বলে থাকেন, সুদ ও মুনাফা একই জিনিস। কিন্তু আসলে তা নয়। সুদ ও মুনাফার পার্থক্যগুলো হলো-
১. লেনদেনের ক্ষেত্রে ঋণের অতিরিক্ত গ্রহণ করলে তা সুদ। অপরদিকে ব্যবসায় মূলধন খাটানোর মাধ্যমে মূলধনের অতিরিক্ত আয় হলো- মুনাফা। ২. সুদের উৎপত্তি ঋণ থেকে। মুনাফার উৎপত্তি ব্যবসার মূলধন বিনিয়োগ থেকে। ৩. সুদে ঋণদাতা ঝুঁকি বহন করে না। কিন্তু মুনাফায় ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। ৪. সুদের ফলাফল ঋণদাতা একা ভোগ করে। অপরদিকে মুনাফা যোগানদার ও ব্যবহারকারী উভয়ই ব্যবহার করে। ৫. সুদ পূর্ব নির্ধারিত। অপরদিকে মুনাফা অর্জিত হয় পরে।
সমাজে সুদের ক্ষতি : ১. দিন দিন সমাজে দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হচ্ছে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। দরিদ্র অভাবগ্রস্ত মানুষ সাহায্যের কোনো পথ খোলা না পেয়ে, উপায়ন্তর না দেখে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। সেই ঋণ অনুৎপাদনী দুরকম কাজেই ব্যবহূত হয়ে থাকে। বিশেষ করে অনুৎপাদনী কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহারের ফলে তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই লোপ পায়। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে করজে হাসানার কোনো সুযোগ না থাকায় অনুৎপাদনী খাতে তো দূরের কথা, উৎপাদনী খাতেও সুদবিহীন ঋণ মেলে না। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো তাকে সুদ শোধ করতে হয়। ফলে সে তার শেষ সম্বল যা থাকে তাই বিক্রি করে উত্তমর্ণের ঋণ পরিশোধ করে থাকে। এই বাড়তি অর্থ পেয়ে উত্তমর্ণ আরো ধনী হয়। একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে সামাজিক শ্রেণিবৈষম্য।
২. দিন দিন সমাজে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় : কৃষকেরা ফসল ফলাবার তাগিদে নিজেরা খেতে না পেলেও ঋণ করে জমি চাষ করে থাকে। এই ঋণ শুধু যে গ্রামের মহাজনের কাছে থেকেই নেয় তা নয়, বিভিন্ন এনজিও ও সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও নেয়। যথোপযুক্ত বা আশানুরূপ ফসল হওয়া সব সময়েই অনিশ্চিত। তাছাড়া, প্রাকৃতিক দুর্বিপাক তো রয়েছেই। যদি ফসল আশানুরূপ না হয় বা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের ফলে ফসল খুবই কম হয় বা মোটেই না হয় তবু কিন্তু কৃষককে নির্দিষ্ট সময়ে সুদসহ ঋণ শোধ করতে হবে। তা না পারলে কি মহাজন, কি ব্যাংকে-সবাই আদালতে নালিশ ঠুকে কৃষকের সহায়-সম্পত্তি গ্রাস করিয়ে নেবে। নীলামে চড়াবে দেনার দায়ে। এভাবেই বিশ্বের সমস্ত পুঁজিপতি দেশে ক্ষুদ্র চাষিরা ক্রমেই ভূমিহীন চাষি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশ তার ব্যতিক্রম নয়।
৩. দিন দিন দ্রব্যমূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পায় : সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী উৎপাদন খরচের ওপর পরিবহন খরচ, শুল্ক (যদি থাকে) এবং স্বাভাবিক মুনাফা যোগ করে পণ্যসামগ্রীর বিক্রি মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে দ্রব্যের এই স্বাভাবিক মূল্যের ওপর উপর্যুপরি সুদ যোগ করে দেওয়া হয়। দ্রব্য বিশেষের ওপর তিন থেকে চার বার পর্যন্ত ক্ষেত্র বিশেষে তারও বেশি সুদ যোগ হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশের বস্ত্রশিল্পের কথাই ধরা যেতে পারে। এই শিল্পের তুলা আমদানির জন্য আমদানিকারকের কাছ হতে ব্যাংকে দেয় ঋণের জন্যে যে সুদ নেয় তা যুক্ত হয় তুলার ওপর। ওই তুলা থেকে সুতা তৈরির সময়ে বস্ত্রকল যে ঋণ নেয় তার সুদও যুক্ত হয় কাপড়ের ওপর। এরপর কাপড়ের পাইকারি বিক্রেতা তার ব্যবসার উদ্দেশ্যে যে ঋণ নেয় তার সুদও যোগ করে ওই কাপড় যখন খুচরা দোকানে আসে, বা প্রকৃত ভোক্তা ক্রয় করে তখন সে আসল মূল্যের চেয়ে বহু গুণ বেশি করে দিয়ে থাকে।
ইসলামী অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা হলে বিনিয়োগের জন্যে যেমন অর্থের অব্যাহত চাহিদা থাকবে তেমনি সঞ্চয়ের সদ্ব্যবহার হবে। ফলে নতুন নতুন কল-কারখানা স্থাপন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সমপ্রসারণের মাধ্যমে অধিক উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সম্পদের পূর্ণবণ্টন ঘটবে। তাছাড়া প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। একচেটিয়া কারবার হ্রাস পাবে। অতি মুনাফার সুযোগ ও অস্বাভাবিক বিনিয়োগ প্রবণতা দূর হবে। এই সমস্ত উদ্দেশ্য সাধন ও সব ধরনের শোষণের পথ বন্ধ করে দেবার উদ্দেশ্যেই ইসলামে সুদকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজ থেকে সুদ নির্মূলের উপায় : বাংলাদেশের মতো একটি দেশে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সুদভিত্তিক অর্থনীতি চালু রয়েছে সেদেশে কিভাবে সুদ উচ্ছেদ করা সম্ভব? সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে কিভাবে ইসলামের অর্থনৈতিক সুবিচারের ছায়াতলে আশ্রয় পাওয়া যেতে পারে? এজন্যে নিচে উল্লেখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যায়। আমাদের বিশ্বাস যদি প্রচেষ্টায় আমরা আন্তরিক ও যত্নবান হই তাহলে আল্লাহরাব্বুল আলামিন তাঁর অসীম রহমতের ছায়াতলে আমাদের ঠাঁই দেবেন।
১. ইসলামী পদ্ধতিতে ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা : আজ সবারই চোখের দেখা বর্তমান প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থার বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি শুধু সফলই প্রমাণিত হয়েছে তাই নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর চাইতে অধিকতর যোগ্যতার সাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্যে আজ অমুসলিম দেশে, এমনকি অমুসলিম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ইসলামী ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিং সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এর বড় উদাহরণ লুক্সেমবার্গ, ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুই দশকেরও বেশি আগে এবং সাফল্যের সাথে ব্যাংকটি পরিচালিত হয়ে আসছে । আরো দুটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯৫ সালে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এদেশের জনগণের মন মানসিককতা প্রবলভাবে ইসলামমুখী অথচ বিদ্যমান আইন কাঠামো, সমাজব্যবস্থা এমনকি ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই মন-মানসিকতা ইসলামবিরোধী। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা ও রোমান-ব্রিটিশ আইন দ্বারা আজো এদেশের ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই কঠিন অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখেই বলা যায়, বাংলাদেশে আরো ইসলামী পদ্ধতির ব্যাংক ও ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন এবং সেসবের সেবা গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া জরুরি ।
২. সমাজে করজে হাসানা ও মুদারিবা সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা : সমাজে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি এবং বিত্তহীন দক্ষ ও যোগ্য লোকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে করজে হাসানা ও মুদারিবাত পদ্ধতি। ইসলামী সমাজের এই অপরিহার্য বিধানটি এদেশে নাই বললে চলে । অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, এমনকি সংখ্যালঘু মুসলমানের দেশ শ্রীলংকাতেও মসজিদভিত্তিক করজে হাসানা প্রদান ও সোসাইটিভিত্তিক মুদারিবাত ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ দেশেও এই ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
সমাজের বিত্তশালী লোকদের করজে হাসানা দেওয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এই উদ্যোগ যদি মসজিদকেন্দ্রিক হয় তাহলে সত্যিকার যোগ্য লোককে যেমন সুযোগ দেওয়া যাবে তেমনি এলাকাভিত্তিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের পাশাপাশি সমাজসচেতনতা ও সমাজকল্যাণ নিশ্চিত হবে। মুদারাবা পদ্ধতি এদেশে চালু করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে আইন কাঠামো বদলানোর, সাথে সাথে উত্তম চরিত্রের লোক সৃষ্টির। উত্তম ও যোগ্য লোকেরা মুদারাবার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি উভয়বিধ উপায়েই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারে। উপরন্তু সমাজের বিত্তশালী লোকদের মনোভাব পরিবর্তনের জন্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্যে প্রয়োজন তাদের ইসলামী অনুশাসন জানতে ও অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করা। করজে হাসানা দিলে সেই অর্থের জন্যে আয়কর দিতে হবে না এবং মুদারাবার ক্ষেত্রে সাহিবে-মালকে মুনাফার নির্দিষ্ট পরিমাণ ঊর্ধ্বের জন্যে আয়কর দিতে হবে এমন আইন করে বিত্তশালী মুসলিমদের মনোযোগ আকর্ষণ করা সম্ভব।
৩. সুদ উচ্ছেদে রাষ্ট্রের প্রদক্ষেপ জরুরি : ইসলামের সু-মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের প্রদক্ষেপ অতি জরুরি, যেমন ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি আল্লামা তাকি উসমানী হাফি. সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে একটি রায় প্রদান করেন। তেমনি বাংলাদেশে যদি প্রধান বিচারপতি সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার রায় প্রদান করতেন; তাহলে এদেশে সুদমুক্ত সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়তে রাষ্ট্রের জন্য খুব সহায়ক ভূমিকা হতো আমি মনে করি। আলোর বাতাস পেতেন এদেশের গরিব- কৃষক নিম্নশ্রেণির হাজারো মানুষ।
লেখক : শিক্ষার্থী, মাহাদুল ইকতিসাদ ওয়াল ফিকহীল ইসলামী, ঢাকা





