সম্রাটকে নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না!

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

সম্রাটকে নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না!

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্লাব ও ক্যাসিনোতে চলমান অভিযানে যুবলীগ, কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা র্যাব ও পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। এখন গুঞ্জন চলছে-ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের আটক নিয়ে। ক্যাসিনো ব্যবসায় ঘুরেফিরে যুবলীগের এ নেতার নাম আসলেও তিনি রয়েছেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে নির্ভরযোগ্য গুঞ্জন উঠেছে, ইতোমধ্যে আটক হয়েছেন সম্রাট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতেই আছেন তিনি। তাকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ার আগে সার্বিক বিষয় বিবেচনা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় তারা। আবার কেউ কেউ বলছেন, সরকারি দলের অনেক রাঘববোয়ালদের বাঁচাতে বলির পাঁঠা হতে পারেন সম্রাট। ক্রসফায়ারও দেওয়া হতে পারে তাকে। আবার কেউ কেউ বলছেন, সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছে সম্রাট। তার দেশত্যাগে ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সব বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।  তবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তাদের নজরদারির মধ্যেই আছেন সম্রাট। তিনি ঢাকাতেই আছেন। সবাই সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পেলে যে কোনো মুহূর্তেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

এ অবস্থায় গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, সম্রাট গ্রেপ্তার কিনা তা দ্রুতই জানা যাবে। সম্রাট হোক যেই হোক অপরাধ করলে আমরা তাকে আইনের আওতায় নেব। যেহেতু অভিযানটি র্যাব শুরু করেছে, তাই ক্যাসিনো অভিযান র্যাবই করবে। এর আওতায় এনে অযথা তথ্য ছাড়া কাউকে যেন বিরক্ত করা না হয়।

অভিযান শুরুর প্রথম তিন দিন দৃশ্যমান ছিলেন সম্রাট। ফোনও ধরতেন। কিন্তু এখন তিনি কোথায় আছেন, তা তার সংগঠনের কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। কেউ কেউ দাবি করেছেন, রাজধানীর বনানী এলাকার একটি বহুতল ভবন থেকে গত শুক্রবার তাকে আটক করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্রাটের আটকের বিষয়ে প্রথম থেকেই জানিয়েছে, সম্রাট পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে। গ্রিন সিগন্যাল পেলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তাকে বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই আলোচনায় আসে যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার নাম। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের চার দিনের মাথায় ১৮ সেপ্টেম্বর সম্রাট-খালেদ নিয়ন্ত্রিত ক্যাসিনোগুলোতে অভিযান শুরু করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। ওই দিনই গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় খালেদকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়েই আতঙ্কে কয়েক শ নেতা-কর্মী নিয়ে কাকরাইলের রাজমণি ঈশা খাঁ হোটেলের বিপরীতে নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেন সম্রাট। সেখানে কয়েক দিন থাকেন তিনি। প্রতিদিনই সেখানে শত শত নেতাকর্মী তাকে পাহারা দিয়ে রাখেন। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তুমুল আলোচনা চলতে থাকে শেষ পর্যন্ত সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না। কয়েক দিনের মাথায় কার্যালয় থেকে সটকে পড়েন সম্রাট। অনেকটা আত্মগোপনে চলে যান তিনি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্রাট এখনো ঢাকায়ই আছেন।

গতকাল শনিবার সরেজমিন কাকরাইলের সম্রাটের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, সপ্তাহ খানেক আগেও তার কার্যালয়ের সামনে শত শত নেতাকর্মীর ভিড় ছিল। গত কয়েক দিনে নেতা-কর্মীদের সংখ্যা কমে ১৫-২০ জনে ঠেকেছে। কারণ হিসেবে নেতা-কর্মীরা জানান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট কয়েক দিন ধরে অফিসে আসছেন না। যে কারণে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি কমেছে। অফিসে না পেয়ে বাসায়ও গিয়েছিলেন কয়েকজন। তাদের একজন জানান, বাসাতেও নেই তিনি। কোথায় আছেন যুবলীগ নেতা সম্রাট, বলতে পারছেন না কেউ।

কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা জানান, অভিযান শুরুর পরদিন কাকরাইলের ওই কার্যালয়ে হাজারো নেতা-কর্মী নিয়ে সারা রাত থাকেন সম্রাট। এর পরদিনও তিনি কার্যালয়ে আসেন বলে জানিয়েছেন একাধিক যুবলীগ নেতা। তবে ২১ সেপ্টেম্বরের পর আর কাকরাইল কার্যালয়ে যাননি তিনি।

গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনটির প্রধান ফটকের কলাপসিবল গেটটি লাগানো রয়েছে। ভেতরে বসা তিনজন গার্ড। বাইরে ১৫-২০ জন নেতা-কর্মী। কেউ কেউ প্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে ঢুকছেন। তবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি। ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট তার কার্যালয়ে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনজন প্রহরী প্রথমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিতে শুরু করেন। মুহূর্তেই তারা আবার একসুরে জানান, স্যার (সম্রাট) অসুস্থ, স্যারের মা-ও অসুস্থ। হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি করছেন। সে কারণে হয়তো অফিসে আসছেন না।

কোন হাসপাতালে আছেন জানতে চাইলে তিন নিরাপত্তারক্ষীর কেউই কোনো জবাব দিতে পারেননি। তবে তারা বলেন, আমরা এখানে চাকরি করি। স্যার কোথায় আছেন জানি না।

সম্রাটের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার বাসায় অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করছেন। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন ওই সূত্রটি। তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, সম্রাট এখনো তার কার্যালয়েই রয়েছেন। তাকে ‘হাউজ অ্যারেস্ট’ করে রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের সদস্য ও একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও নিয়মিত ওই কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। তবে সম্রাটের অবস্থানের বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত আসামিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে বেনাপোল সীমান্তসহ সব ইমিগ্রেশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সর্তকতা অবস্থানে বলে জানিয়েছেন বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিন খান। তিনি বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় বেনাপোল ইমিগ্রেশন ও সীমান্তপথে বিভিন্ন কৌশলে ভারতে পালিয়ে যেতে পারেন আসামিরা। ফলে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পুলিশ ইমিগ্রেশনে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ওসি মহসিন খান জানান, ঢাকা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে তাদের কাছে একটি নির্দেশনা এসেছে। যুবলীগের ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও নেপালের ৯ নাগরিক যাতে কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারেন, তার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন নতুন নতুন আরো নামের তালিকা আসছে বলেও জানান ওসি।

বিজিবির ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম রেজা ও ২১ ব্যাটালিয়ন বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় ঘোষিত অপরাধীরা যাতে কোনোভাবে সীমান্তপথে অবৈধভাবে ভারতে পালাতে না পারেন, সেজন্য সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads