করোনাকালীন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ঘোষণা করা হলো সর্বোচ্চ ঘাটতির বাজেট, যার পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই বিশাল অঙ্কের ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করেন।
প্রতি বছরই দেশের বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। তবে ব্যয়ের সাথে সঙ্গতি রেখে বাড়ছে না আয়। ঘাটতি পূরণে নির্ভর করতে হয় দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। অভ্যন্তরীণ উৎস ও বৈদেশিক ঋণ নিয়ে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকঋণ এবং বিদেশি ঋণের পাশাপাশি অনুদানের অর্থ দিয়ে পূরণ করা হবে এই ঘাটতি। তবে এবার ব্যাংকঋণে নির্ভরতা খানিকটা কমিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাড়িয়েছেন সঞ্চয়পত্র থেকে ধারের অঙ্ক। নতুন বাজেটে বিদেশি ঋণের নির্ভরতাও পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেকটাই বাড়িয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। বিপুল পরিমাণ এই অর্থের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ অর্থ জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে রাজস্ব খাত থেকে। এর পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। বাকি ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে দেশি-বিদেশি ঋণ থেকে, যা মোট জিডিপির ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
ঘাটতির এই অর্থের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। আর বিদেশ থেকে ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। ঘাটতি পূরণে সম্ভাব্য বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।
আবার অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরো ৫ হাজার ১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
বিপুল অঙ্কের ঋণের সুদ : এদিকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি খরচ হবে বিপুল পরিমাণ এই ঋণের সুদ পরিশোধে। এর পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটে প্রস্তাবিত ব্যয়ের ১১.৩৬ ভাগ। সুদ পরিশোধে ব্যয় করা এই অর্থ দেশে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতু নির্মাণ খরচের দ্বিগুণেরও বেশি। বর্তমানে পদ্মার দুই পাড় সংযুক্ত করা সেতুর সার্বিক নির্মাণে খরচ হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
ঘাটতি পূরণে ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ খরচ দিতে হবে ৬২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হবে ৬ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। বিদেশি উৎসের তুলনায় অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বেশি। কিন্তু সরকার বিদেশি উৎস থেকে আশানুরূপ ঋণ না পাওয়ায় বেশি সুদ দিয়ে অভ্যন্তরীণ ঋণেই বেশি ভরসা রাখছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এবার বিদেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছে।
চলতি বা বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে সুদ পরিশোধ খাতে সুদ ভর্তুকি রাখা হয় ৬৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেট ব্যয়ের ১১.২৩ শতাংশ। তবে সংশোধিত বাজেটে এই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। তা সত্বেও সংশোধিত বাজেটের হিসাব থেকেও প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য সুদ খাতে ব্যয়ের খরচ ৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা বেশি।
একইভাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও সুদ পরিশোধে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল ৫৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা, যদিও সংশোধিত বাজেটে তার আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুদ ভর্তুকি ব্যয় ছিল ৪৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। তারও আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে ৪১ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সুদ পরিশোধ খাতে খরচ ছিল ৩৫ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যা ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৩৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকা।
তবে সরকারের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘কৌশলগতভাবে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত ভালো উদ্যোগ। দুটো কারণে-প্রথমত এটার সুদের পরিমাণ কম। সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হলে ১১-১২ শতাংশ সুদ দিতে হয়। কিন্তু বৈদেশিক যেসব উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহ করা হবে সেখানে সুদের পরিমাণ সর্বোচ্চ দেড় থেকে দুই শতাংশ। দ্বিতীয়ত, এসব ঋণের বেশিরভাগই দীর্ঘ মেয়াদের। ২৫-৩০ বছর মেয়াদের এসব ঋণ পরিশোধে তেমন বেগ পেতে হয় না। আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের এখন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও অনেক বেড়েছে।’
ড. আতিউর রহমানের মতে, সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে অর্থনীতির চাকা আরো সচল হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়বে। তখন আর ঋণ নিতে হবে না। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।





