সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি:
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার জেরে দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান বারেক গ্রুপের হামলায় পুলিশের পরিদর্শকসহ ৯ সদস্য আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
হামলায় ৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হওয়া ও ১১ জনকে গ্রেপ্তার করার বিষয় নিশ্চিত করেন সিরাজদিখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই ঘটনায় গতকাল রাতে উপপরিদর্শক (এসআই) লোকমান বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আজ মঙ্গলবার সকালে গ্রেফতার আসামিদেরকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের বড়বর্তা গ্রামের স্থানীয় ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক ব্যাপারী, রেজাউল বারি, তায়েফ ভূইয়া তৌফিক আহমেদ তুষার, আমিনুল ইসলাম ও ফরহাদ হোসেন; কুচিয়ামোড়া গ্রামের ইস্রাফিল শেখ, মো. রুবেল, আ. হাকিম ও সৈকত হোসেন এবং ইসলামপুরের মো. আসাদুজ্জামান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেয়াইন ইউপির চেয়ারম্যান আশ্রাফ আলী ও তাঁর ছেলে আসিফ শেখ স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম সারোয়ার কবীরকে সমর্থন দিয়ে তাঁর পক্ষে কাজ করেন। একই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক এবং রাকিব রাজু ও ফরহাদসহ কয়েকজন মহিউদ্দিন আহমেদকে সমর্থন দিয়ে তাঁর পক্ষে কাজ করেন। নির্বাচনে মহিউদ্দিন আহমেদ জয়ী হন। এরপর বিভিন্ন স্থানে গোলাম সারোয়ার কবীরের সমর্থক আসিফসহ তাঁদের লোকজনদের উসকানিমূলক কথাবার্তাসহ বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন জয়ী প্রার্থী মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদের সমর্থকেরা।
গতকাল সোমবার বিকেল ৫টার দিকে কুচিয়ামোড়া কলেজ গেট এলাকায় কয়েকজন বন্ধুসহ আসিফ আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তাঁদেরকে দেখতে পেয়ে উসকানিমূলক মন্তব্য করেন সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক গ্রুপের রাকিব রাজু ও ফরহাদসহ কয়েকজন। আসিফরা এর প্রতিবাদ করলে রাকিব রাজু ও ফরহাদদের সঙ্গে তাঁদের মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে বারেক গ্রুপের রাকিবসহ আরও একজন আহত হন।
মারধরের জেরে কেয়াইন ইউপির চেয়ারম্যান আশ্রাফ আলির সমর্থক সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান আলিকে রাস্তায় পেয়ে মারধর করে গুরুতর আহত করেন সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক ও তাঁর লোকজন। পরে শাহজাহান আলিকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। জাতীয় সংসদের নির্বাচন পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায় এই দুই পক্ষের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ রয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
খবর পেয়ে সিরাজদিখান থানা-পুলিশ কুচিয়ামোড়া কলেজ গেট এলাকায় হাজির হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এ সময় সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেকের নেতৃত্বে রাজু ও ফরহাদসহ ১০০ থেকে ১৫০ জনের সংঘবদ্ধ দল পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে সিরাজদিখান থানার পুলিশ পরিদর্শকসহ ৯ সদস্য আহত হয়েছেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক গ্রুপের ১১ জনকে আটক করা হয়।
এ বিষয়ে গোলাম সারোয়ার কবীরের সমর্থক মো. আসিফ শেখ বলেন, নির্বাচনে কবীর ভাই হেরে যাওয়ার পর থেকে জয়ী প্রার্থীর সমর্থকেরা আমাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছিলেন। তাঁরা আমাদেরকে বিভিন্ন স্থানে পেয়ে উসকানিমূলক কথাবার্তাসহ মারধরের হুমকি দিয়ে আসছিল। গতকাল বিকেলে কলেজগেট এলাকায় বসেছিলাম। তখন রাকিব, রাজু ও ফরহাদ আমাদের ওপর মোটরসাইকেল উঠিয়ে দেয়। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আমাদের মারামারি হয়। পরে পুলিশ এলে তাঁরা পুলিশের ওপর হামলা চালান।
এ বিষয়ে জানতে কেয়াইন ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেকসহ তাঁর লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাকিবের বাবা মো. মফজুলের দাবি, তাঁর ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। মফজুল বলেন, বিনা কারণে চেয়ারম্যানের ছেলেসহ ১৫-২০ জন রাকিবকে পিটিয়েছেন। রাকিবের মুখের হাড় ও দাঁত ভেঙে দিয়েছেন। শরীরে বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জখম হয়েছে। ছেলের অবস্থা ভালো নয়।
সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান আলী বলেন,আমিতো কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। শুধু শুধু আমাকে পিটিয়ে মাথা ফাটানো হলো।
এ বিষয়ে সিরাজদিখান ও শ্রীনগর থানা এলাকার দায়িত্বে থাকা সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীনগর সার্কেল) তোফায়েল হোসেন বলেন, আমরা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বারেক সাহেবের একটি অভিযোগের ভিত্তিতে সেখানে যাই। আাশ্রুফ চেয়ারম্যানের লোকজন যেই পাশে অবস্থান করছিল সেই পাশে আমি গেলে শুনতে পাই সাবেক চেয়ারম্যান বারেক সাহেবের লোকজন পুলিশের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালিয়েছে।
সহকারী পুলিশ সুপার তোফায়েল হোসেন আরও বলেন, হামলায় সিরাজদিখান থানার পুলিশ পরিদর্শকসহ আনুমানিক ৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে কেউ গুরুতর নন। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে আটক করে থানায় পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে।





