নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে। এতে প্রতি লিটারে ডিজেল ও কেরোসিনে কমেছে ৩ টাকা। বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটারে ডিজেল ও কেরোসিন কিনতে হবে ১০৬ টাকা দরে। আগের চেয়ে যা সোয়া ২ টাকা কম। যা ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে এর প্রভাব নেই কোথাও।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মিল রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানির দাম নির্ধারিত হচ্ছে। দুই দফায় মিলে লিটারে ৩ টাকা কমেছে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম। এ সুবিধা সাধারণ মানুষ পায়নি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, লিটার ১০০ টাকা করা যেতে পারে। এর আগেও লিটারে ৫ টাকা কমেছিল। তখনো কিন্তু পরিবহন ভাড়া কমেনি। এবার দুই দফায় মিলে লিটারে ৩ টাকা কমেছে, পরিবহন মালিকরা কিছু বলছে না। যদি দাম বাড়ে তখনই বলে ওঠে পরিবহন ভাড়া বাড়াতে হবে।
দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে অথচ বাস ও পণ্যবাহী পরিবহনের ভাড়া কমানোর কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি। এর আগেও ৩ পয়সা হারে কমিয়ে বাস ভাড়ার তালিকা পুনর্নির্ধারণ করা হলেও যাত্রীসাধারণ এই ৩ পয়সা কমানোর সুফল পায়নি। তখন থেকে সরকার পরিবহন মালিকদের বিশেষ সুবিধা দিতে এহেন ছোট ছোট অংকের হারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমানো হচ্ছে কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এম শামসুল আলম বলেন, এতে সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পায়নি। দাম নির্ধারণ করার কথা ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। জ্বালানি বিষয়ে অধিকার খর্ব করা হয়েছে। আইন রহিত করার ফলে আমরা কোনো সুফল পাচ্ছি না। জ্বালানির সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। সরকারকে জ্বালানি প্রাইস স্ট্যাবিলাইজড ফান্ড গঠন করার পরামর্শ দিয়েছিলাম আমরা। তেলের দাম বেড়ে গেলে সেখান থেকে ভর্তুকি দেয়ার কথা বলেছিলাম। আর কমলে উদ্বৃত্ত এখানে জমা দিতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা সেটা শোনেনি। উদ্বৃত্ত টাকা নয়-ছয় হচ্ছে। অস্বচ্ছতা রয়েছে দাম কমানো বা বাড়ানোর পুরো প্রক্রিয়ায়।
প্রথম দফায় গত ৮ মার্চ থেকে দর কার্যকর হয়। ওই দফায় প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনে দাম কমেছে ৭৫ পয়সা। পেট্রোল কমেছে ৩ টাকা ও অকটেনে কমেছে ৪ টাকা। অকটেনের দাম কমে হয় ১২৬ টাকা, পেট্রোলে কমে হয় ১২২ টাকা। যা দ্বিতীয় দফায় অপরিবর্তিত রয়েছে ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগে ভোক্তা পর্যায়ে তেমন কোনো সুফল মিলছে না। তেলের দাম কমলেও পরিবহন ভাড়া কমে না কোথাও। কিন্তু দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে ভাড়া বেড়ে যায়। এ অবস্থায় তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে বিকল্প উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থাৎ যখন বিশ্ববাজারে দাম কম এবং দেশে বেশি থাকে, তখন বাড়তি মুনাফা আলাদা তহবিলে রাখতে হবে। আবার যখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়বে, তখন দেশে দাম না বাড়িয়ে ওই তহবিলের অর্থ দিয়ে সমন্বয় করতে হবে।
জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের সূত্র নির্ধারণ করে নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয় গত ২৯ ফেব্রুয়ারি। এতে বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত অকটেন ও পেট্রোল ব্যক্তিগত যানবাহনে বেশি ব্যবহৃত হয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে বিলাসদ্রব্য (লাঙারি আইটেম) হিসেবে সব সময় ডিজেলের চেয়ে অকটেন ও পেট্রোলের দাম বেশি রাখা হয়। অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে সব সময়ই মুনাফা করে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসি। মূলত ডিজেলের ওপর বিপিসির লাভ-লোকসান নির্ভর করে। দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৭৫ শতাংশই ডিজেল। দীর্ঘ সময় ধরে ডিজেল বিক্রি করেও মুনাফা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ক্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও আগেই দাম কমানোর সুযোগ ছিল।
ভর্তুকির চাপ এড়াতে ২০২২ সালের আগস্টে গড়ে ৪২ শতাংশ বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২৩ দিনের মাথায় ওই মাসের শেষ দিকে প্রতি লিটারে ৫ টাকা করে কমানো হয় দাম। ডিজেলের দাম কমলে বাস ও ট্রাক মালিকদের খরচ কমবে। সেচের ব্যয়ও কমবে। অকটেন ও পেট্রোলের দাম কমলে ব্যয় কমবে গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের। যদি বাস ও ট্রাক ভাড়া না কমে, তাহলে পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও কমবে না। সাধারণ মানুষ সুফল পাবে না।





